প্রতি ৩ টাকার ১ টাকাই আর ফেরত আসছে না
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। এই একটা সংখ্যাই বলে দিচ্ছে দেশের ব্যাংক খাত ঠিক কতটা চাপে আছে।
সংক্ষেপে: ২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। এই হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ। এতদিন শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন, কিন্তু দেশটি খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনায় বাংলাদেশ এখন তালিকার এক নম্বরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসেই তা আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও একবার খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা ছুঁয়েছিল।
বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশগুলো
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সর্বশেষ পাওয়া তথ্য পাশাপাশি রাখলে যে চিত্র উঠে আসে:
| অবস্থান | দেশ | খেলাপি ঋণের হার | তথ্যের সময় |
|---|---|---|---|
| ১ | বাংলাদেশ | ৩২.৭৮% | জুন ২০২৬ |
| ২ | চাদ | ৩১.৫১% | ডিসেম্বর ২০২৩ |
| ৩ | ইকুয়েটোরিয়াল গিনি | ৩০% | সর্বশেষ হালনাগাদ |
| ৪ | আলজেরিয়া | ২০.০৫% | ডিসেম্বর ২০২৫ |
| ৫ | ঘানা | ১৮.১১% | প্রথম প্রান্তিক, ২০২৬ |
লক্ষণীয় বিষয় হলো, চাদের তথ্য ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর আর হালনাগাদ হয়নি — অর্থাৎ বর্তমানে সেখানকার প্রকৃত অবস্থা ভিন্নও হতে পারে। তালিকার বাকি দেশগুলোর তথ্য তুলনামূলক নতুন।
হঠাৎ নয়, বহুদিনের লুকানো সমস্যাই এখন প্রকাশ্যে
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই খেলাপি ঋণ একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বহু সমস্যাগ্রস্ত ঋণকে কাগজে-কলমে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসে। ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল ঋণ এখন খাতায় খেলাপি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের — এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশিই এখন খেলাপি। আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণও একই পথে।
রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায় মন্দা এবং জ্বালানিসংকট — এই কারণগুলোও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউক্রেন কীভাবে শীর্ষস্থান থেকে সরে গেল?
ইউক্রেনের খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০২৩ সালে ৩৭.৪ শতাংশ, রাশিয়ার হামলার পরের ধাক্কায় যা প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল। কিন্তু ২০২৪ সাল থেকে চিত্র বদলাতে শুরু করে।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বেড়েছিল ১০.৩ শতাংশ, একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার নেমে আসে ২৭ শতাংশে। বড় পরিবর্তন আসে ডিসেম্বরে, যখন প্রিভাতব্যাংকসহ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বিপুল পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন করে।
ফলাফল: ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৩.৯১ শতাংশ, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারিতেই তা নেমে আসে ১৩.৯২ শতাংশে। এ বছরের ১ জুলাইয়ে এই হার আরও কমে দাঁড়ায় ১২.৫ শতাংশ — গত প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তবে অবলোপনের মানে ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। এই ঋণগুলো আগেই শতভাগ সঞ্চিতি দিয়ে সংরক্ষিত ছিল বলে ব্যালান্স শিট থেকে সরানো গেছে। ঋণগ্রহীতাদের কাছে টাকা আদায়ের অধিকার ব্যাংকের এখনো আছে — প্রিভাতব্যাংক এই অর্থ উদ্ধারে ইউক্রেনের বাইরে লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
পার্থক্যটা স্পষ্ট: ইউক্রেন পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে, আদায় বাড়িয়েছে ও নতুন ভালো মানের ঋণ দিয়েছে — ফলাফল, খেলাপির পরিমাণ ও হার দুটোই কমেছে। বাংলাদেশে ঘটেছে এর উল্টো — লুকানো খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসায় সংখ্যাটা লাফিয়ে বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, দুই বছরেই তা তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন কী করছে?
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে:
- ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে
- দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান নতুন করে পর্যালোচনা চলছে
- কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে
- ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু হয়েছে
এসব পদক্ষেপের কারণেই আগে “নিয়মিত” দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে ধরা পড়ছে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের নানা ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে — যদিও অবলোপন বা পুনঃতফসিল করলে কাগজে খেলাপি ঋণ কমতে পারে, তাতে পাওনা টাকা আসলে আদায় হয় না।
আইএমএফ নিজেও সতর্ক করেছে, কঠোর শ্রেণীকরণ নীতি ও সম্পদের মান পর্যালোচনায় সামনে আরও খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসতে পারে।
খেলাপি ঋণ কি সহজে কমবে?
সহজে কমার সম্ভাবনা কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফল পেতে হলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ ও অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন খারাপ ঋণ তৈরি ঠেকানো জরুরি।
এগুলো ধারাবাহিকভাবে করা গেলে মধ্যমেয়াদে খেলাপি ঋণ কমতে পারে। কিন্তু আবারও নির্বিচার পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে হার সাময়িক কমলেও মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
এই তালিকায় থাকা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বাংলাদেশ কি সত্যিই বিশ্বে খেলাপি ঋণে শীর্ষে?
হ্যাঁ। আইএমএফের ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস ডেটাবেজে থাকা দেশগুলোর সর্বশেষ তথ্য তুলনা করলে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ।
এত খেলাপি ঋণ কি নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে?
পুরোটা নয়। বড় অংশই বহু বছর ধরে পুনঃতফসিল ও হিসাবগত কৌশলে লুকানো ছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিরীক্ষায় তা প্রকাশ্যে এসেছে।
ইউক্রেন কীভাবে তালিকা থেকে বের হলো?
পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, আদায় ও পুনর্গঠন এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটির খেলাপি ঋণের হার নেমে আসে ১২.৫ শতাংশে।
খেলাপি ঋণ কমাতে কি ঋণ মাফ করে দেওয়া হয়?
না। অবলোপন মানে ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে নেওয়া, মাফ নয়। ব্যাংকের কাছে টাকা আদায়ের অধিকার তখনো থাকে।
সংস্কার শুরু হয়েছে, ফল আসতে সময় লাগবে
খারাপ খবরের ভেতরেও একটা ইতিবাচক দিক আছে — লুকিয়ে রাখা সমস্যা এখন অন্তত প্রকাশ্যে এসেছে, যা সমাধানের প্রথম শর্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগ ও কড়া তদারকি অব্যাহত থাকলে, ইউক্রেনের মতো মধ্যমেয়াদে এই হার নামিয়ে আনা অসম্ভব নয়।
তবে এই সংখ্যাগুলো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পাল্টায় — বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী হালনাগাদে চিত্র বদলাতে পারে, তাই নতুন প্রতিবেদন এলে তথ্য যাচাই করে নেওয়াই ভালো।










