রংপুরে সাংবাদিক উৎস হত্যা মামলার রায়: একজনের ফাঁসি, দুজনের যাবজ্জীবন

সেপ্টেম্বর 4, 2026 10:39 অপরাহ্ন
রংপুরে সাংবাদিক উৎস হত্যা মামলার রায়ে আদালতের প্রতীকী ছবি

রংপুরে সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান হত্যা মামলায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মশিউর রহমান খান এই রায় ঘোষণা করেন। তবে মামলার মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত এক নারীকে আদালত বেকসুর খালাস দেওয়ায় নিহতের পরিবার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

সংক্ষিপ্ত তথ্য

  • মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত: রুবেল ওরফে হেকরম
  • যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত: এলিন ও শুভ কুমার (দুজনেই পলাতক)
  • খালাসপ্রাপ্ত: চিহ্নিত মাদককারবারি জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদি
  • মামলার বয়স: প্রায় ১০-১১ বছর
  • সম্ভাব্য কারণ: মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশের জেরে হত্যা বলে অভিযোগ

ঘটনার সূত্রপাত

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় স্থানীয় দৈনিক যুগের আলো কার্যালয়ে গিয়েছিলেন সাংবাদিক মশিউর রহমান। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে রংপুর নগরীর ধর্মদাস এলাকায় একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন  লালমনিরহাটে বাড়ছে অনলাইন জুয়া-ক্যাসিনো আসক্তি, ধরাছোঁয়ার বাইরে এজেন্টরা

এই ঘটনায় নিহতের মা নুরজাহান বেগম নুরী রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়, পরে আদালত তাদের মধ্যে ৬ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেন।

আরো পড়ুন: প্রতি ১০০ টাকার ৩৩ টাকাই খেলাপি: বিশ্বে সর্বোচ্চ ঋণখেলাপির দেশ এখন বাংলাদেশ

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও রায়

মামলাটির বিচারকাজ চলে প্রায় ১০-১১ বছর ধরে (একটি সূত্র অনুযায়ী ১০ বছর ৯ মাসের বেশি, অন্য সূত্র অনুযায়ী প্রায় ১১ বছর)। এই সময়ে ১১ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে বুধবার চূড়ান্ত রায় দেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় নিয়েও সূত্রে সামান্য পার্থক্য পাওয়া গেছে — একটি প্রতিবেদনে দুপুরের কথা বলা হলেও অন্য একটি প্রতিবেদনে বেলা পৌনে তিনটার সময়ের কথা উল্লেখ আছে। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী এবং বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ।

আরও পড়ুন  লটারিতে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে প্লে থেকে ১ম শ্রেণিতে ভর্তি: ফরম নিবেন যেভাবে

হত্যার নেপথ্যে সম্ভাব্য কারণ

বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগের বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবাদিক উৎস রহমান মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করতেন এবং সে কারণেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

পরিবার ও আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া

মামলার বাদী নুরজাহান বেগম রায়ে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং সঠিক বিচার পেতে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, অভিযোগ অনুযায়ী জহিরন আক্তার ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে সাংবাদিক উৎস রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা করিয়েছিলেন, তবু আদালত তাকে খালাস দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাদী জানিয়েছেন, এই কারণে রাষ্ট্রপক্ষ সংক্ষুব্ধ এবং উচ্চ আদালতে আপিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগের ভাষ্যে, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী পার পেয়ে গেলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

সাংবাদিক মহলেও রায় নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে। বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের রংপুর জেলা সভাপতি মমিনুল ইসলাম রিপনের মতে, অর্থের জোগানদাতা ও নির্দেশদাতা কে ছিলেন তা সবার জানা থাকলেও প্রমাণের ঘাটতিতে আদালত তাকে খালাস দিয়েছেন। দৈনিক যুগান্তরের রংপুর ব্যুরো ও আমাদের প্রতিদিনের সম্পাদক মাহবুব রহমান হাবুও এই রায়কে সন্তোষজনক মনে করছেন না, কারণ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পলাতক এবং মূল পরিকল্পনাকারী খালাস পেয়েছেন।

আরও পড়ুন  শ্যাম্পুর খালি প্যাকেট নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১৫, আইসিইউতে একজনের মৃত্যু

রংপুর সিটি প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন চৌধুরীও এই রায়ে সাংবাদিক সমাজ সন্তুষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন, কারণ দণ্ডপ্রাপ্তরা পলাতক থাকা অবস্থায় মূল হোতাও খালাস পেয়ে গেছেন। রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সালেকুজ্জামান ছালেক জানিয়েছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতির কারণে মূল অভিযুক্ত খালাস পেয়েছেন বলে তারা মনে করছেন এবং এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বৈঠকে বসবেন।

এরপর কী হতে পারে

নিহতের পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষ এবং তাদের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মামলাটি উচ্চ আদালতে গড়ালে খালাসপ্রাপ্ত আসামির বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা হবে।

ঢাকা পোস্ট ও প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী এই তথ্য সংকলিত হয়েছে।

Juger Alo

তথ্যের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাসী Juger Alo টিম। পাঠকদের কাছে দ্রুত সঠিক খবর, চাকরি ও ক্যারিয়ারের আপডেট এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পৌঁছে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now