---Advertisement---

হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করবেন যেভাবে

সেপ্টেম্বর 3, 2026 2:05 পূর্বাহ্ন
হাতে লেখা পুরোনো জন্ম নিবন্ধন ১৭ ডিজিটে ডিজিটাল করার নিয়ম ও অনলাইন আবেদন পদ্ধতি
---Advertisement---

Table of Contents

হাতে লেখা জন্ম সনদ নিয়ে NID অফিসে ফেরত এলাম কেন?

গত মাসে ভাইয়ের জন্য নতুন NID করাতে গিয়ে কাউন্টার থেকে সোজা ফিরিয়ে দেওয়া হলো। কারণ একটাই — ওর জন্ম সনদটা ১৯৯৮ সালের, হাতে লেখা, ১৬ ডিজিটের। অফিসার শুধু বললেন, “আগে এটা ডিজিটাল করে আনুন, তারপর আসুন।” আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই এক লাইনের কথায় পুরো একটা দিনের প্ল্যান ভেস্তে যায়। পরে বুঝলাম, দেশে এখনো লাখো মানুষের হাতে এমন পুরোনো সনদ আছে যা সরকারি সার্ভারে খুঁজেই পাওয়া যায় না। সমস্যাটা আসলে জটিল না, শুধু প্রসেসটা কেউ ঠিকভাবে গুছিয়ে বলে না।

সংক্ষিপ্ত উত্তর: হাতে লেখা বা পুরোনো জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করতে হলে প্রথমে bdris.gov.bd পোর্টালে অনলাইনে “তথ্য সংশোধন/ডিজিটাইজেশন” আবেদন জমা দিতে হয়, সেই আবেদনের প্রিন্ট কপি নিয়ে মূল সনদসহ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে যেতে হয়। নিবন্ধক পুরোনো রেজিস্টার বইয়ের সাথে মিলিয়ে যাচাই করে তথ্য BDRIS সার্ভারে এন্ট্রি করলে ১৭ ডিজিটের নতুন ডিজিটাল সনদ পাওয়া যায়, যা এখন সব জায়গায় গ্রহণযোগ্য।

এই ঝামেলার আসল ভুক্তভোগী কারা, একটু ভাবুন। স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে ছোট ছোট বাচ্চারা, কারণ তাদের বাবা-মায়ের সনদ পুরোনো বলে সন্তানের নতুন নিবন্ধনও আটকে থাকে। পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সিরিয়াল ধরে দাঁড়ানোর পর “সনদ অনলাইনে নেই” শুনে বাসায় ফিরে আসতে হয় বহু মানুষকে। বিয়ের রেজিস্ট্রেশন, চাকরির আবেদন, এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময়ও এই একই সমস্যা বারবার সামনে আসে।

সমস্যাটা শুধু কাগজের না, মানসিক ধকলেরও। যারা গ্রাম থেকে শহরে এসে কাজ খোঁজেন, তাদের জন্য বারবার ইউনিয়ন পরিষদে ফিরে যাওয়া মানে একদিনের রোজগার বন্ধ। কেউ কেউ তো জানেনই না যে তাদের সনদ এখনো সার্ভারে নেই, যতক্ষণ না জরুরি প্রয়োজনে গিয়ে হোঁচট খান। এই অনিশ্চয়তা আর দৌড়াদৌড়ির চাপ থেকেই এই লেখাটা লিখছি, যাতে আপনাকে আর কাউন্টার থেকে খালি হাতে ফিরতে না হয়।

  • ভর্তি, পাসপোর্ট বা চাকরির আবেদনে হঠাৎ আটকে যাওয়া
  • একই অফিসে বারবার যাতায়াতের সময় ও খরচ নষ্ট
  • নাম বা তারিখের ভুল সংশোধনের জন্য বাড়তি দৌড়ঝাঁপ
  • পরিবারের সবার সনদ একসাথে ডিজিটাল না থাকলে বিভিন্ন সরকারি সেবায় সমন্বয়হীনতা

পুরোনো জন্ম সনদ ডিজিটাল করতে কী কী কাগজ লাগবে?

পুরোনো জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং বাবা-মায়ের এনআইডি কার্ড
হাতে লেখা জন্ম সনদ ডিজিটাল করার আবেদনে জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মূল সনদ, ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তালিকা।

সরাসরি বলি — মূল হাতে লেখা সনদ, আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম তারিখের প্রমাণপত্র, এবং বাবা-মায়ের NID কপি থাকলেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাজ শুরু করা যায়। এর বাইরে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাড়তি কাগজ লাগতে পারে, নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

প্রথম ধাপ: অনলাইনে আবেদন, তারপর অফিসে যাওয়া

একটা জিনিস অনেকেই জানেন না — এখন আর সরাসরি অফিসে গিয়ে সাদা কাগজে বা ম্যানুয়াল ফরমে আবেদন জমা দিলেই কাজ হয় না। প্রথমে bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে “জন্ম তথ্য সংশোধন” বা “ডিজিটাইজেশন”-এর অনলাইন আবেদন পূরণ করে সাবমিট করতে হয়। এই আবেদনের একটা প্রিন্ট কপি (আবেদন নম্বরসহ) বের করে, সেটা মূল সনদ ও অন্যান্য কাগজের সাথে নিয়ে তবেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা অফিসে যেতে হয়। এই অনলাইন ধাপটা বাদ দিয়ে সরাসরি অফিসে গেলে অনেক ক্ষেত্রে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তাই আগে অনলাইনে আবেদন করে নেওয়াই ভালো।

জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করার আবেদন ফরমে কী কী তথ্য দিতে হয়?

অনলাইন আবেদনে মূলত পাঁচটি অংশ পূরণ করতে হয় — শিশু বা আবেদনকারীর পূর্ণ নাম (বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায়), জন্ম তারিখ, জন্মস্থানের ঠিকানা, বাবা-মায়ের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, এবং পুরোনো সনদের নিবন্ধন নম্বর। প্রাথমিক তথ্য যাচাই করে নিতে চাইলে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাই পেজের নির্দেশনাও কাজে লাগতে পারে।

জরুরি একটা বিষয় মনে রাখা দরকার — বাবা-মায়ের নামের বানান NID-তে যেভাবে লেখা, ফরমেও ঠিক সেভাবেই লিখতে হবে। এক অক্ষর এদিক-ওদিক হলেই আবেদন ফেরত আসে। নিজের ভাইয়ের ক্ষেত্রে এই ছোট্ট ভুলের কারণেই আরেকবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল, তাই এখন থেকে সবসময় NID-র কপি সাথে রেখেই ফরম পূরণ করি।

ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন ছবি নিয়ে কী নিয়ম মানতে হয়?

ছবি সংক্রান্ত নিয়ম নির্ভর করে বয়সের ওপর। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা ছবি লাগে না, বাবা অথবা মায়ের NID-এর তথ্য দিয়েই কাজ চলে। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য নির্ধারিত মাপের (সাধারণত পাসপোর্ট সাইজ) সদ্য তোলা রঙিন ছবি জমা দিতে হয়, যেখানে মুখ স্পষ্ট দেখা যায় এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা বা হালকা রঙের হয়। পুরোনো, ঝাপসা বা কালো-সাদা ছবি জমা দিলে আবেদন প্রায়ই আটকে যায়।

নিচের ভিডিওতে পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে, যাতে ফরম পূরণের সময় কোনো ভুল না হয়:

পুরোনো সনদ থেকে নতুন ১৭ ডিজিটের সনদ পাওয়া পর্যন্ত পুরো যাত্রাটা এক নজরে দেখে নিন এই ভিডিওতে।

বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি কী কাগজ লাগতে পারে?

যাদের বয়স বেশি এবং অনেক পুরোনো (যেমন আশির বা নব্বইয়ের দশকের) হাতে লেখা সনদ ডিজিটাল করতে চান, তাদের ক্ষেত্রে শুধু বাবা-মায়ের NID যথেষ্ট নাও হতে পারে। এসএসসি বা জেএসসি সনদ, চাকরির পিআরএল (অবসর-পূর্ব ছুটি) সংক্রান্ত কাগজ, বা নিজের NID-তে থাকা জন্ম তারিখের সাথে মিল যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত প্রমাণপত্র চাওয়া হতে পারে। অফিসে যাওয়ার আগে এই কাগজগুলোও সাথে রাখলে দ্বিতীয়বার যাওয়ার ঝামেলা এড়ানো যায়।

সাধারণ সনদ আবেদন বনাম হাতে লেখা সনদ ডিজিটাল করার আবেদন — পার্থক্য কোথায়?

দুটো প্রক্রিয়া দেখতে প্রায় একই রকম মনে হলেও কাগজপত্র ও সময়ের দিক থেকে বেশ পার্থক্য আছে।

বিষয়নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদনহাতে লেখা সনদ ডিজিটাল করার আবেদন
প্রয়োজনীয় মূল কাগজটিকা কার্ড/হাসপাতালের ছাড়পত্রপুরোনো হাতে লেখা মূল সনদ
সময় লাগেসাধারণত ৩-৭ কার্যদিবস৭-১৫ কার্যদিবস (যাচাইয়ের কারণে)
ফিবয়সভেদে ভিন্ন (নিচে টেবিল দেখুন)তথ্য সংশোধন/ডিজিটাইজেশন ফি প্রযোজ্য
যাচাই প্রক্রিয়াতুলনামূলক সহজপুরোনো রেজিস্টার বই মিলিয়ে যাচাই

পুরোনো ১৩ বা ১৬ ডিজিটের নম্বর কীভাবে ১৭ ডিজিট হয়?

পুরোনো হাতে লেখা সনদে অনেক সময় ১৩ বা ১৬ ডিজিটের নিবন্ধন নম্বর দেখা যায়। নিবন্ধক যখন তথ্য BDRIS সার্ভারে এন্ট্রি করেন, তখন সিস্টেম নিজে থেকেই জাতীয় ফরম্যাট অনুযায়ী নম্বরটাকে ১৭ ডিজিটে রূপান্তর করে দেয় — এতে আবেদনকারীর আলাদা করে কিছু করার দরকার নেই। এই কারিগরি খুঁটিনাটি নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে, শুধু এটুকু জেনে রাখা দরকার যে পুরোনো নম্বরটা একেবারে বাতিল হয়ে যায় না, বরং নতুন ফরম্যাটে রূপান্তরিত হয় এবং সনদে দুটো নম্বরই (পুরোনো রেফারেন্স ও নতুন ১৭ ডিজিট) সাধারণত পাওয়া যায়।

আবেদনের পর কী কী ধাপ পার হতে হয়?

  • অনলাইন আবেদনের প্রিন্ট কপি, মূল সনদ ও অন্যান্য কাগজ জমা দেওয়ার পর নিবন্ধক আগের রেজিস্টার খাতার সাথে তথ্য মিলিয়ে দেখেন
  • তথ্য সঠিক হলে ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সেটি BDRIS সার্ভারে এন্ট্রি হয়
  • এন্ট্রি সম্পন্ন হলে নতুন ১৭ ডিজিটের নিবন্ধন নম্বর তৈরি হয়
  • এরপর মোবাইল দিয়ে জন্ম নিবন্ধন ডাউনলোড করার নিয়ম অনুসরণ করে ডিজিটাল কপি সংগ্রহ করা যায়
  • আবেদন কোন পর্যায়ে আছে তা জন্ম নিবন্ধন আবেদনের অবস্থা পেজ থেকে যাচাই করা যায়

মিথ বনাম বাস্তবতা:

  • মিথ: পুরোনো হাতে লেখা সনদ ডিজিটাল করতে নতুন করে ডাক্তারি পরীক্ষা বা বয়স প্রমাণের আলাদা মেডিকেল সনদ লাগে।
  • বাস্তবতা: সাধারণ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো মেডিকেল পরীক্ষা লাগে না; পুরোনো সনদের নম্বর ও রেজিস্টার বইয়ের এন্ট্রি মিলে গেলেই কাজ হয়ে যায়। শুধু নাম বা জন্ম তারিখে বড় ধরনের গরমিল থাকলে বাড়তি প্রমাণপত্র চাওয়া হতে পারে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত দাপ্তরিক নির্দেশিকায় পুরো ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়ার নিয়মকানুন বিস্তারিতভাবে দেওয়া আছে, চাইলে সেখান থেকেও নিয়মগুলো যাচাই করে নিতে পারেন। এছাড়া ইউনিসেফ বাংলাদেশের জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত পেজে দেখা যায়, ডিজিটাল নিবন্ধন শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সনদ যাচাইয়ের চূড়ান্ত ধাপটি everify.bdris.gov.bd পোর্টালে গিয়েই সম্পন্ন করতে হয়, যেটি এই পুরো সিস্টেমের মূল সরকারি প্ল্যাটফর্ম।

ডিজিটাল সনদ পাওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদে ঝামেলামুক্ত থাকার কৌশল

সনদ ডিজিটাল হয়ে গেলেই কাজ শেষ, এমন ভাবার সুযোগ নেই। হাতে পাওয়া নতুন ১৭ ডিজিটের সনদটা প্রথম দিনেই তিন জায়গায় ব্যবহার করে দেখে নেওয়া ভালো — যেমন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, স্কুলের ভর্তি পোর্টাল, বা NID সংশোধন সিস্টেম। এতে বোঝা যায় সব তথ্য সার্ভারে ঠিকভাবে বসেছে কি না, কারণ প্রায় ১০-১৫% ক্ষেত্রে দেখা যায় নাম বা জন্মতারিখে ছোট একটা গরমিল থেকে যায় যা প্রথম ব্যবহারেই ধরা পড়ে।

আসল সনদ কেন সবসময় হাতের কাছে রাখা দরকার?

ডিজিটাল কপি থাকলেও মূল হাতে লেখা সনদটা ফেলে দেওয়া বা হারিয়ে ফেলা ঠিক না। ভবিষ্যতে সার্ভারে কোনো তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, এই মূল কাগজটাই একমাত্র প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। একটা প্লাস্টিক ফোল্ডারে রেখে ঘরের নির্দিষ্ট একটা জায়গায় সংরক্ষণ করলে বছরের পর বছর নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

নতুন সনদ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে সেটার একটা স্ক্যান কপি নিজের ইমেইলে বা গুগল ড্রাইভে আপলোড করে রাখা ভালো অভ্যাস। এতে পরে মোবাইল হারিয়ে গেলেও বা কাগজ ভিজে গেলেও তথ্যটা হাতের নাগালে থাকে। এই ছোট্ট অভ্যাসটা একবার তৈরি করে ফেলার পর আর কখনো কাগজ খুঁজে না পাওয়ার দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়নি।

একসাথে একাধিক সনদ ডিজিটাল করলে সময় কতটা বাঁচে?

পরিবারের একাধিক সদস্যের সনদ একই সময়ে ডিজিটাল করার আবেদন করলে যাচাই প্রক্রিয়া প্রায় একই সময়ে চলে, ফলে আলাদা আলাদা করে আবেদন করার চেয়ে গড়ে ৩-৫ কার্যদিবস সময় বাঁচে। একই পরিবারের একাধিক সদস্য একসাথে গেলে নিবন্ধকও রেজিস্টার বই একবারই খুঁজে সবগুলো তথ্য যাচাই করতে পারেন, যেটা আলাদা আলাদা দিনে গেলে সম্ভব হয় না।

করণীয়:

  • আবেদনের আগে সব সদস্যের মূল সনদ ও NID একসাথে গুছিয়ে রাখা
  • একই দিনে, সকালের দিকে অফিসে যাওয়া (ভিড় কম থাকে)
  • প্রতিটি আবেদনের রসিদ নম্বর আলাদা করে নোট করে রাখা

বর্জনীয়:

  • ফটোকপি ছাড়া শুধু মূল কাগজ নিয়ে যাওয়া (অনেক অফিসেই কপি রাখতে হয়)
  • অনলাইন আবেদনের প্রিন্ট কপি ছাড়া সরাসরি অফিসে চলে যাওয়া

যেসব ভুলে আবেদন বারবার আটকে যায়

জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করার আবেদনে যেসব ভুলে আবেদন বাতিল বা আটকে যায়
BDRIS পোর্টালে জন্ম তথ্য সংশোধনের সময় নামের বানান বা কাগজপত্রের যে ভুলের কারণে আবেদন বারবার আটকে যায়।

সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া ভুলটা হলো, মূল সনদের ফটোকপি জমা দিয়ে অরিজিনাল কপি ফেরত নিয়ে আসা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিবন্ধক অফিসে মূল কাগজ যাচাইয়ের জন্য জমা রাখেন এবং একটা রসিদ দেন। এই রসিদটাই তখন আপনার একমাত্র প্রমাণ, কিন্তু অনেকে এটাকে গুরুত্বহীন কাগজ মনে করে ফেলে দেন — পরে সনদ নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। তাই রসিদ পাওয়ার সাথে সাথেই সেটাকে ফোল্ডারে বা ফোনে ছবি তুলে সংরক্ষণ করে রাখা উচিত।

আরেকটা সাধারণ ভুল হলো, নামের বানান নিয়ে অসতর্কতা। বাবা বা মায়ের নাম NID-তে যেভাবে আছে, ঠিক সেভাবে না লিখলে সিস্টেম দুটো তথ্যকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত করে। এতে আবেদন পুরোপুরি বাতিল না হলেও যাচাই প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়, কখনো কখনো মাসখানেক পর্যন্তও গড়ায়।

কেউ কেউ আবার তাড়াহুড়ায় দালাল বা অপরিচিত মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে আবেদন করিয়ে ফেলেন, বাড়তি টাকার বিনিময়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শুনে। এতে ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায় — তথ্য ভুল বসানো, রসিদ হারিয়ে ফেলা, এমনকি মূল কাগজ হাতছাড়া হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। সরাসরি অফিসে গিয়ে বা নির্ধারিত সরকারি হেল্পলাইনে যোগাযোগ করলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়, যদিও সময় একটু বেশি লাগতে পারে।

একটা কমন ভুল হলো, আবেদন জমা দেওয়ার পর একদম চুপচাপ বসে থাকা। প্রক্রিয়াটা মাঝেমধ্যে ধীরগতির হতে পারে বলে ৭-১০ দিন পার হয়ে গেলেও কোনো খোঁজ না নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে আবেদন হারিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। রসিদ নম্বর দিয়ে মাঝে মাঝে অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সমস্যা থাকলেও দ্রুত ধরা পড়ে।

  • মূল কাগজের রসিদ সংরক্ষণ না করা
  • নামের বানানে অসতর্কতা
  • অপরিচিত মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা
  • আবেদনের পর অগ্রগতি একেবারেই ফলো-আপ না করা
  • নির্ধারিত সময়ের আগেই বারবার একই অফিসে গিয়ে চাপ দেওয়া (এতে বরং কাজ ধীর হতে পারে)

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌরসভা থেকে সাড়া না পেলে কী করবেন?

কখনো কখনো আবেদন জমা দেওয়ার পর নিবন্ধক বা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে দীর্ঘদিন কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। এমন হলে প্রথমে রসিদ নম্বর নিয়ে সরাসরি অফিসে গিয়ে লিখিতভাবে অবস্থা জানতে চাওয়া উচিত। কাজ না হলে উপজেলা নির্বাচন অফিস বা উপজেলা পরিষদের স্থানীয় সরকার শাখায় অভিযোগ জানানো যায়, কারণ ইউনিয়ন পরিষদ এই শাখার অধীনেই কাজ করে। এরপরও সমাধান না পেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বা BDRIS হেল্পলাইনে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করতে সরকারি ফি কত?

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত ২০১৭ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত ফি এখনো কার্যকর আছে। মনে রাখা ভালো, এলাকাভেদে এবং সময়ের সাথে এই ফি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে স্থানীয় অফিসে একবার যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ।

সেবার ধরননির্ধারিত ফি (দেশের অভ্যন্তরে)
জন্ম নিবন্ধন (০-৪৫ দিন বয়সে)বিনামূল্যে
জন্ম নিবন্ধন (৪৬ দিন থেকে ৫ বছর বয়সে)২৫ টাকা
জন্ম নিবন্ধন (৫ বছরের বেশি বয়সে)৫০ টাকা
তথ্য সংশোধন/ডিজিটাইজেশন ফিসাধারণত ৫০ টাকা
জন্ম তারিখ সংশোধন ফিসাধারণত ১০০ টাকা

কম্পিউটার বা ডিজিটাল সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে আবেদন করালে সরকারি ফি ছাড়াও তাদের সার্ভিস চার্জ আলাদাভাবে দিতে হয়, যা সাধারণত ৫০-১০০ টাকার মধ্যে থাকে।

হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করা নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন

হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করতে কত টাকা লাগে?

সাধারণত তথ্য সংশোধন বা ডিজিটাইজেশনের জন্য ৫০ টাকা এবং জন্ম তারিখেও সংশোধন লাগলে বাড়তি ১০০ টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হতে পারে (২০১৭ সালের গেজেট অনুযায়ী)। এলাকাভেদে সামান্য তারতম্য থাকতে পারে বলে স্থানীয় অফিসে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।

ডিজিটাল না করলে কি পুরোনো সনদ একেবারেই বাতিল হয়ে যাবে?

না, পুরোনো সনদ আইনগতভাবে বাতিল হয় না, কিন্তু বেশিরভাগ অনলাইন সেবায় এটি গ্রহণযোগ্য হয় না। NID, পাসপোর্ট বা ভর্তির মতো কাজে এখন প্রায় সবখানেই ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল সনদ চাওয়া হয়।

ডিজিটাল করার আবেদন করতে কি সরাসরি অফিসে যেতেই হবে?

হ্যাঁ, প্রথমে bdris.gov.bd-তে অনলাইনে আবেদন করলেও মূল সনদ যাচাইয়ের জন্য একবার সরাসরি অফিসে যেতে হয়। চূড়ান্ত ডিজিটাইজেশনের জন্য নিবন্ধকের সরাসরি যাচাই ছাড়া কাজ সম্পন্ন হয় না।

একবার আবেদন বাতিল হলে আবার নতুন করে আবেদন করা যায়?

হ্যাঁ, যায়। বাতিলের কারণ জেনে নিয়ে সেই তথ্য সংশোধন করে আবার একই অফিসে নতুন আবেদন জমা দেওয়া যায়, এতে বাড়তি কোনো জটিলতা তৈরি হয় না।

বিদেশে থাকা অবস্থায় কি এই আবেদন করা সম্ভব?

সরাসরি অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন, কারণ মূল সনদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি স্থানীয় অফিসেই হয়। এক্ষেত্রে দেশে থাকা পরিবারের কোনো সদস্যকে দায়িত্ব দিয়ে বা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধি নিয়োগ করে কাজটি করানো যায়।

পুরোনো ১৩ বা ১৬ ডিজিটের নম্বর কি নতুন সনদে থাকবে না?

নতুন সনদে মূলত ১৭ ডিজিটের নম্বরটাই প্রধান হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে পুরোনো রেফারেন্স নম্বরটাও অনেক সময় সনদে বা রেজিস্টার রেকর্ডে সংরক্ষিত থাকে। এই রূপান্তর সিস্টেম নিজে থেকেই করে দেয়, আবেদনকারীর আলাদা কিছু করার দরকার হয় না।

আজ থেকেই যা করতে পারেন

সনদটা ডিজিটাল করা মানে শুধু একটা কাগজ বদলানো না, এটা ভবিষ্যতের অনেক ঝামেলা থেকে বাঁচার একটা প্রস্তুতি। যাদের হাতে এখনো পুরোনো সনদ পড়ে আছে, তাদের জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো সময় কাজটা সেরে ফেলার, জরুরি প্রয়োজনের অপেক্ষায় না থেকে।

নিজের পরিবারের সনদ ডিজিটাল করানোর পর যে স্বস্তিটা পেয়েছি, সেটা এখন আপনাদের সাথে শেয়ার করতে পারলে ভালো লাগবে। কাগজপত্র গুছিয়ে একদিন সময় বের করে আগে অনলাইনে আবেদন করুন, তারপর স্থানীয় অফিসে চলে যান, বাকি প্রক্রিয়াটা এখন থেকে আপনার কাছে অনেক সহজ মনে হবে।

একটা কথা মনে করিয়ে দিই — আমি নিজে শুধু এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন সাধারণ মানুষ, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইনি পরামর্শদাতা না। তাই ফি, সময়সীমা বা কাগজপত্রের নির্দিষ্ট চাহিদা এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিজের এলাকার নিবন্ধক কার্যালয়ে একবার সরাসরি খোঁজ নিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

Juger Alo

তথ্যের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাসী Juger Alo টিম। পাঠকদের কাছে দ্রুত সঠিক খবর, চাকরি ও ক্যারিয়ারের আপডেট এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পৌঁছে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now