বাংলাদেশে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। এর মধ্যেই গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণগ্রস্তদের জন্য ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে। শাস্তির বদলে বারবার এই ছাড় দেওয়ার নীতি নিয়েই মূল প্রশ্ন তুলেছে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন — বড় খেলাপিরা আসলে কেন পার পেয়ে যাচ্ছেন?
এক নজরে:
- খেলাপি ঋণ: জুন ২০২৫ পর্যন্ত ছয় লাখ ছয় হাজার পাঁচ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ
- মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ হিসাবে তা পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা
- ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর সার্কুলার: ১,০০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের ১৫ বছরে পরিশোধ, প্রথম দুই বছর কিস্তি লাগবে না
- আবেদনের সময়: সেপ্টেম্বরের মধ্যে; ব্যাংকগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে
দুই দশকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে কতটা
২০০৯ সালে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ এক হাজার কোটি টাকায়।
২০২৬ সালের মার্চে এসে এই অঙ্ক পৌঁছেছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই দশকেরও কম সময়ে খেলাপি ঋণের বোঝা সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তার পরও পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপির স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ছয় লাখ ছয় হাজার পাঁচ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ বলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাত দিয়ে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম। বিশ্বে খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে আগের একটি প্রতিবেদনেও এই প্রবণতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছিল।
কেন বড় খেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন?
২০২৪ সালে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেও খেলাপি ঋণ কমার বদলে বেড়েই চলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছে: রাজনৈতিক প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ, তদারকির ঘাটতি, এবং ব্যাংক পরিচালকদের নিজেদের বা আত্মীয়দের নামে-বেনামে ঋণ নেওয়া। গত দুই দশকে দেশের কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠী ও ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারিও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
খেলাপির বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রভিশন হিসেবে জমা রাখার নিয়ম থাকলেও অনেক ব্যাংক তা রাখতে পারছে না, ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
আইনি জটিলতাও একটা বড় কারণ। অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে পাঁচ থেকে সাত বছর লেগে যায়, তাই ব্যাংকগুলো নিজেরাই মামলা করতে আগ্রহী হয় না।
বড় খেলাপিদের বেশিরভাগই শিল্প গোষ্ঠী, যাদের কারখানায় বহু শ্রমিক কাজ করেন এবং রপ্তানিতে যাদের ভূমিকা বড়। চাপ দিলে কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বাড়তে পারে—এই যুক্তিতেই তাদের বারবার ‘বাঁচিয়ে রাখার’ নীতি নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব বিবিসি বাংলাকে বলেছেন:
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান আইনে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি।
অন্য দেশ কীভাবে সামলায়
প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে বড় খেলাপিদের ক্রেডিট স্কোর শূন্য হয়ে যায়, ফলে নতুন ঋণ পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। চীনে খেলাপিদের রাখা হয় সামাজিক ক্রেডিট ব্ল্যাকলিস্টে।
প্রতিবেশী ভারতে ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপ্টসি কোড’-এর মাধ্যমে বড় খেলাপি কোম্পানির সম্পদ নিলামে তোলা হয়। বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালত ও খেলাপি ঋণ আদায়ের আইন থাকলেও বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপের নজির কম বলেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়ের যুক্তি
৩১ আগস্ট জারি হওয়া সার্কুলারে এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর ১৫ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি লাগবে না। এই সুবিধা নিতে চাইলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে হবে, আর ব্যাংকগুলো তা ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরও একটি প্রজ্ঞাপনে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির অন্তত দুই শতাংশ নগদ জমা দেওয়ার শর্তে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, সঙ্গে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের পরিশোধ সময়। একই সময় অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলও ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই ছাড়ের পেছনে তিনটি কারণ তুলে ধরেছে—মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষতি, বাজারভিত্তিক সুদহারে ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যাওয়া, এবং খেলাপি কমানোর জন্য ঘোষিত ১৮ মাসের রোডম্যাপের অংশ হিসেবে এই বাড়তি সময় দেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, মামলায় ফেলে রাখলে ১০ বছরেও যে টাকা আদায় হবে না, আলোচনার মাধ্যমে তার অর্ধেক এখনই আদায় হলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো হবে।
সমালোচনা কী বলছে
অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, ঋণ পুনঃতফসিল করা হলে খাতায়-কলমে খেলাপি কমলেও ব্যাংকে আদতে কত টাকা ফেরত আসবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এতে ভালো ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে বৈষম্য এবং অপরাধ করেও পার পাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন:
এই সুযোগ পেয়ে খেলাপিরা আরও খেলাপির দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি আছে, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ওপর ছেড়ে দিয়েছে এবং এতে ব্যাংকগুলোরও বড় দায়িত্ব থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কমিশন গঠন, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত বিচার এবং খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণ ও নতুন ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর পদক্ষেপের।
এরপর কী হতে পারে
ড. আহসান হাবীবের ভাষ্যমতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সংস্কৃতি ভাঙা সহজ কাজ নয় এবং এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথেষ্ট কঠোর অবস্থানে যায়নি; বর্তমান ছাড় যেন অপব্যবহার না হয় এবং তা যেন সাময়িক সুবিধা হিসেবেই থাকে, সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই উদ্যোগের সাফল্য-ব্যর্থতা মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। ব্যাংকগুলো যতক্ষণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে, ততক্ষণই এসব পদক্ষেপ খাতকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মূলত ঋণগুলো নিয়মিত করে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্সশিট পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে বলে তিনি জানিয়েছেন, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ ফেরাতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে আরও সময় লাগবে বলেই তার ধারণা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ঋণ খেলাপি ছাড়ের সুযোগ কারা পাবেন?
১,০০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ৩১ আগস্টের সার্কুলার অনুযায়ী পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন সাপেক্ষে।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ কেন কমছে না?
রাজনৈতিক প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ, তদারকির অভাব এবং ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে ঋণ নেওয়াকে বিশ্লেষকরা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কি নেওয়া যায় না?
অর্থঋণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইন থাকলেও মামলা নিষ্পত্তিতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগে বলে ব্যাংকগুলো মামলা করতে সাধারণত আগ্রহী হয় না।
সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?
বড় খেলাপিরা মূলত শিল্প গোষ্ঠী, যাদের কারখানায় বহু শ্রমিক কাজ করেন ও রপ্তানিতে ভূমিকা আছে। তাদের ওপর চাপ দিলে কারখানা বন্ধ ও বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কা থেকেই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়ের নীতিতে হাঁটছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ও রেয়াত সুবিধার আবেদন প্রক্রিয়া ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, ফলে বিষয়টি এখনো চলমান। নতুন তথ্য এলে তা এই প্রতিবেদনে যোগ করা হবে।
সোর্স: বিবিসি বাংলা










