চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার উনকিলা গ্রামের মালয়েশিয়াপ্রবাসী সাইফুল ইসলাম খোকনকে সরকারি চাকরি পাওয়ার কয়েক মাসের মাথায় তালাক দিয়েছেন তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। সাইফুলের অভিযোগ, প্রায় চার বছর ধরে স্ত্রীর পড়াশোনা ও কোচিংয়ের পুরো খরচ প্রবাসের আয় থেকে তিনি বহন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি ইতোমধ্যে চাঁদপুর আদালতে মামলা করেছেন।
সংক্ষেপে ঘটনা:
- ঘটনাস্থল: চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার উনকিলা গ্রাম
- অভিযুক্ত: জান্নাতুল ফেরদৌস, অফিস সহকারী, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়
- ভুক্তভোগী: মালয়েশিয়াপ্রবাসী স্বামী সাইফুল ইসলাম খোকন
- চাকরিতে যোগদান: ২ জানুয়ারি ২০২৬
- বর্তমান অবস্থা: চাঁদপুর আদালতে মামলা দায়ের, নিষ্পত্তি এখনো বাকি
বিয়ে ও প্রবাসজীবনের শুরু
২০১৬ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় শাহরাস্তি উপজেলার রায়শ্রী উত্তর ইউনিয়নের উনকিলা গ্রামের মরহুম সিরাজুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম খোকনের সঙ্গে একই উপজেলার রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের। বিয়ের চার মাসের মাথায় কর্মসূত্রে সাইফুল আবার মালয়েশিয়ায় ফিরে যান।
আরো পড়ুন: একলাফে ২০ টাকা বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম, আজ থেকেই নতুন দর কার্যকর
চার বছরের পড়াশোনার খরচ ও নমিনি প্রসঙ্গ
প্রবাসে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর উচ্চশিক্ষার আগ্রহের কথা জানার পর সাইফুল প্রথমে কুমিল্লা শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে তার এইচএসসি পড়ার ব্যবস্থা করে দেন।
পরে ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে সেখানেও সম্মতি দেন তিনি। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর ধরে ঢাকায় থাকা-খাওয়া, কোচিং ও পড়াশোনার সব খরচ প্রবাসী আয় থেকেই মিটিয়েছেন সাইফুল।
এই সময়ের মধ্যেই কর্মচারী সমিতির মাধ্যমে জমি বা প্লট কেনার জন্য এককালীন ও মাসিক কিস্তিতে অর্থ দেওয়ার কথা জানিয়ে একটি আবেদনপত্রের কপি সাইফুলকে পাঠান জান্নাতুল, যেখানে তাকে নমিনি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এরপর সাইফুল দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানালে স্ত্রী আরও কিছুদিন প্রবাসে থাকার পরামর্শ দেন এবং দেশে ফেরার আগে স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র দেওয়ার দাবি জানান বলে অভিযোগ আছে।
চাকরি পাওয়ার পর যা ঘটল
চার বছর কোচিং করার পর ২ জানুয়ারি ২০২৬ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে অফিস সহকারী পদে নিয়োগ পান জান্নাতুল ফেরদৌস, যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী। খবরটি জানার পর সাইফুল ও তার পরিবার আনন্দিত হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরো পড়ুন: এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু: আত্মহত্যার প্ররোচনায় গ্রেপ্তার এমপি
তবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমতে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। এর আগের মতো নিয়মিত কথা না হওয়ায় সাইফুলের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
না জানিয়ে দেশে ফেরা ও অফিসে মুখোমুখি
সন্দেহ বাড়তে থাকায় সাইফুল স্ত্রীকে না জানিয়ে ১ জুলাই দেশে ফিরে আসেন এবং সরাসরি স্ত্রীর কর্মস্থলে গিয়ে হাজির হন। দেখা হওয়ার পর জান্নাতুল ফেরদৌস তাকে অপেক্ষায় রেখেই চলে যান বলে এজাহার সূত্রে জানা গেছে।
এরপর গ্রামের বাড়িতে ফিরে বিষয়টি শ্বশুরবাড়িতে জানালে পারিবারিকভাবে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই সাইফুলের বাড়িতে স্ত্রীর পাঠানো তালাকের নোটিশ পৌঁছায়।
পরিবার ও এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
জান্নাতুলের ছোট ভাই ফয়সাল তালাকের নোটিশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার দাবি, প্রবাসে থাকাকালে সাইফুল বোনের খোঁজখবর ঠিকমতো রাখতেন না, এ কারণেই তালাক দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বোনের লেখাপড়া, কোচিং এবং ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ সাইফুলের টাকাতেই হয়েছিল।
আরো পড়ুন: সরকারি চাকরিতে তদবির করলেই বিপদ! নতুন নির্দেশনায় কড়া হুঁশিয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের
জান্নাতুলের চাচা ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. শাহজাহানের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি, বলেছেন বিস্তারিত মেয়ের কাছ থেকেই জানা উচিত। একাধিকবার চেষ্টা করেও জান্নাতুল ফেরদৌসের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, ফলে তার নিজের বক্তব্য জানা যায়নি।
মামলার বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি পদক্ষেপ
প্রতারণার প্রতিকার চেয়ে সাইফুল ইসলাম ইতোমধ্যে চাঁদপুর আদালতে মামলা দায়ের করেছেন এবং তার গচ্ছিত অর্থ ও সম্পদ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।
আইনি দিক থেকে বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী স্ত্রী তালাকের নোটিশ পাঠালেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না। নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশনে পাঠাতে হয়, এরপর সমঝোতার জন্য সালিশি বৈঠকের সুযোগ থাকে এবং কোনো সমাধান না হলে নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর ধরা হয়।
কারও পড়াশোনা বা সংসারের পেছনে ব্যয় করা অর্থ ফেরত না দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হলে দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় সাধারণত এ ধরনের অভিযোগে মামলা হয়ে থাকে — তবে এই নির্দিষ্ট মামলাটি ঠিক কোন ধারায় দায়ের হয়েছে, তা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম সাপেক্ষে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
প্রবাসী পরিবারের সামাজিক বাস্তবতা
বছরের পর বছর দেশের বাইরে থেকে পরিবারের জন্য উপার্জন পাঠানো, সন্তান বা সঙ্গীর পড়াশোনার পেছনে বিনিয়োগ করা — এটি বাংলাদেশের অসংখ্য প্রবাসী পরিবারের পরিচিত চিত্র। তবে দীর্ঘদিন দূরে থাকার কারণে সম্পর্কে তৈরি হওয়া দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আর দেশে ফিরে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া প্রবাসীদের জন্য আর্থিক ও মানসিক—দুই দিক থেকেই বড় ধাক্কা।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!







