একলাফে ২০ টাকা বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম, আজ থেকেই নতুন দর কার্যকর

সেপ্টেম্বর 21, 2026 8:32 পূর্বাহ্ন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রতীকী চিত্র, গাড়িতে তেল ভরার সময় ঊর্ধ্বমুখী মূল্য বৃদ্ধির গ্রাফ ও তেলের ব্যারেল

ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন — চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে। ডিজেল এখন ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা — দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম।

আজকের জ্বালানি তেলের নতুন দামের তালিকা

জ্বালানির ধরনপূর্বের দর (টাকা/লিটার)নতুন দর (টাকা/লিটার)বৃদ্ধি
ডিজেল১১৫১৩৫২০ টাকা
কেরোসিন১৩৫১৫৫২০ টাকা
পেট্রোল১৪০১৬০২০ টাকা
অকটেন১৪৫১৬৫২০ টাকা

কার্যকর: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১২টা থেকে

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত। এই বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণ পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে দেশে পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি।

জ্বালানি তেল নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে তেল কিনে বিপিসিকে মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এ কারণেই সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বলে তিনি জানান।

আরও পড়ুন  এআই যুগে চাকরি হারানোর ভয়, নাকি নতুন সুযোগ?

বিপিসির লোকসান কত, দাম বাড়ানোর যুক্তি কী

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে শুধু ডিজেলেই প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান হচ্ছে প্রায় ৮৯ টাকা, যাতে দৈনিক লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।

এই হারে চলতে থাকলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকার মনে করছে।

আমদানি ব্যয় মেটাতে চলতি বছর বিপিসি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে। বর্তমানে তাদের ব্যাংক হিসাবে আছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, অথচ দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতেই প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে বিপিসি লোকসানের অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে চেয়েছিল এবং দাম সমন্বয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিল। এরপর গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে একটি বৈঠক হয়, যেখানে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য রহমান অমিত, জ্বালানি সচিব ও বিপিসির চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানিয়েছে, ওই বৈঠকে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছিল।

প্রতিবেশী দেশের তুলনায় দাম কম, তাই পাচারের ঝুঁকি

প্রজ্ঞাপনে দাম বাড়ানোর আরেকটি কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের ব্যবধান তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন  বেকারি পণ্যের দাম বাড়ছে ২০ শতাংশ, কার্যকর হতে পারে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে
দেশডিজেলের দাম (টাকা/লিটার)
কলকাতা, ভারত১৩৪.৭৬
ভিয়েতনাম১৩৭.০০
মালদ্বীপ১৪০.৭১
সংযুক্ত আরব আমিরাত১৪৪.৭৯
থাইল্যান্ড১৫১.২২
নেপাল১৬১.২৪
মিয়ানমার১৬৪.৮৩
ফিলিপাইন১৬৮.৫৩
শ্রীলঙ্কা১৭৯.৪২
পাকিস্তান১৮৫.৪৮

নতুন দামেও (১৩৫ টাকা) বাংলাদেশের ডিজেল এই তালিকার বেশিরভাগ দেশের তুলনায় এখনো সস্তা।

নতুন মূল্য কাঠামো: কীভাবে ঠিক হলো লিটারপ্রতি দাম

রোববারের গেজেটে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কাঠামোর বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে। ডিজেলের কর-উত্তর এক্স-রিফাইনারি মূল্য ধরা হয়েছে লিটারপ্রতি ১২৩ টাকা ৫৮ পয়সা, কেরোসিনে ১৪৩ টাকা ৭৮ পয়সা, অকটেনে ১৪৯ টাকা ৭৮ পয়সা এবং পেট্রোলে ১৪৪ টাকা ৯৯ পয়সা। এর সঙ্গে ভ্যাট, শুল্ক, বিপণন কোম্পানির মার্জিন ও তহবিলের অর্থ যোগ করে মূল স্থাপনা কেন্দ্র মূল্য দাঁড়িয়েছে ডিজেলে ১৩০ টাকা ১৩ পয়সা, কেরোসিনে ১৫০ টাকা ৮২ পয়সা, অকটেনে ১৫৭ টাকা ১২ পয়সা এবং পেট্রোলে ১৫২ টাকা ২৩ পয়সা।

এর সঙ্গে ডিলারের স্থানীয় পরিবহন খরচ (লিটারপ্রতি ১ টাকা ১৬ পয়সা) এবং ডিলার-এজেন্ট কমিশন (ডিজেলে ৩ টাকা ৭১ পয়সা থেকে অকটেনে ৬ টাকা ৭২ পয়সা পর্যন্ত) যোগ করে ভোক্তা পর্যায়ের চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

সাত মাসে চার দফায় বাড়ল দাম

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম ছিল যথাক্রমে ১০০, ১১২, ১১৬ ও ১২০ টাকা। মার্চ পর্যন্ত এই দামই বহাল ছিল।

যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনীভূত হওয়ার জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মার্চের শেষে প্রায় ১২০ ডলারে ওঠে। এর ফলে গত ১৮ এপ্রিল রাতে সরকার প্রথম দফায় বড় মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণা করে — ডিজেল ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে যথাক্রমে ১১৫, ১৩০, ১৩৫ ও ১৪০ টাকা করা হয়। গত জুনে দ্বিতীয় দফায় কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয় (ডিজেল অপরিবর্তিত থাকে)। রোববার রাতের প্রজ্ঞাপনে তৃতীয় দফায় চার ধরনের তেলের দামই ২০ টাকা করে বাড়ল।

আরও পড়ুন  United Healthcare Stock Under Spotlight After Earnings and 2026 Forecast

ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা বেশি।

যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেকর্ড অনুযায়ী এবারের দাম বৃদ্ধি সরকারি ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ — সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে, যখন ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) সাড়ে ১৫ বছরে ডিজেল-কেরোসিনের দাম ৪৪ টাকা থেকে বেড়ে ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সা হয়েছিল, অর্থাৎ বৃদ্ধি ছিল ১৪২ শতাংশ।

পরিবহন, কৃষি ও শিল্পে বাড়বে ব্যয়

নতুন দাম কার্যকর হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। ডিজেলচালিত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে নিত্যপণ্যের বাজারে।

কৃষিতেও সেচ পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও ধান মাড়াইয়ের কাজে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে, ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। শিল্প খাতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও উৎপাদনের কাজেও বাড়তি খরচ গুনতে হবে, বিশেষত গ্যাস সংকটে যেসব শিল্প বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি ব্যবহার করে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এই দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাবে এবং সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের হিসাবে, জ্বালানি তেল কিনতে জনগণকে প্রতি মাসে আগের চেয়ে ৯০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন (FAQ)

নতুন দাম কবে থেকে কার্যকর হয়েছে?

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাত ১২টা থেকে, অর্থাৎ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে।

চার ধরনের জ্বালানির নতুন দাম কত?

ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা প্রতি লিটার।

দাম কেন বাড়ানো হলো?

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির বিপুল লোকসান হচ্ছিল, যা কমাতেই এই মূল্যবৃদ্ধি।

ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস ও গণপরিবহনের ভাড়া কি বাড়ছে?

ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সাধারণত বাস, ট্রাক ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করে দূরপাল্লা ও মহানগরের বাস ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। দ্রুতই এ বিষয়ে নতুন ভাড়ার তালিকা আসতে পারে।

সিএনজি (CNG) ও এলপিজি (LPG) গ্যাসের দামও কি বেড়েছে?

না, সরকারি এই প্রজ্ঞাপনে কেবল তরল জ্বালানি (ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন)-এর দাম বাড়ানো হয়েছে। সিএনজি এবং রান্নার সিলিন্ডার (এলপিজি) গ্যাসের দামের ওপর এই মূল্যবৃদ্ধির কোনো প্রভাব নেই, এগুলো আগের দামেই রয়েছে।

Juger Alo

তথ্যের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাসী Juger Alo টিম। পাঠকদের কাছে দ্রুত সঠিক খবর, চাকরি ও ক্যারিয়ারের আপডেট এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পৌঁছে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now