১-এর পরে ১০০টি শূন্য: গুগল নামের আসল মানে কী?
১ লিখুন, তারপর তার পরে টানা ১০০টি শূন্য বসান। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সব পরমাণু গুনলেও এই সংখ্যার কাছে পৌঁছানো যায় না।
মজার ব্যাপার হলো, এই সংখ্যার নাম রেখেছিল নয় বছরের একটা ছেলে। সেই নামের বানান ভুল হয়ে যে শব্দটা তৈরি হলো, আপনি হয়তো আজই সেটা কয়েকবার বলেছেন: গুগল।
তাহলে গুগল এর বাংলা অর্থ কি? উত্তরটা এক লাইনে দেওয়া যায়, কিন্তু পেছনের গল্পটা এক লাইনে ধরে না।
সংক্ষেপে উত্তর: “গুগল” একটি বিশেষ নাম, তাই এর কোনো নির্দিষ্ট আক্ষরিক বাংলা অর্থ নেই। এটি এসেছে গণিতের শব্দ “গোগল” (Googol) থেকে, যার মানে ১-এর পরে ১০০টি শূন্য। ইন্টারনেটের অসংখ্য তথ্য খুঁজে দেওয়ার ক্ষমতা বোঝাতেই এই নাম বেছে নেওয়া হয়েছিল।
নামটা নিয়ে এত কৌতূহল কেন?
প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকেই বহু মানুষ গুগলের অর্থ, পূর্ণরূপ আর কোম্পানির নাম খুঁজছেন। যে জিনিসটা আমরা সারাদিন ব্যবহার করি, তার নামের মানে অনেকেই জানি না।
ইন্টারনেটে এই নিয়ে ভুল তথ্যও কম ঘোরে না। আসল গল্পটা সেসবের চেয়ে মজার, আর সেটা শুরু হয়েছিল একটা ছোট্ট টাইপো দিয়ে।
গুগল নামের পেছনের গল্পটা কী?
গোগল শব্দটা কে বানিয়েছিলেন?
গোগল শব্দটা বানিয়েছিল মিল্টন সিরোটা নামের নয় বছরের এক ছেলে। সে ছিল মার্কিন গণিতবিদ এডওয়ার্ড কাসনারের ভাগ্নে।
কাসনার ভাগ্নেকে বলেছিলেন, ১-এর পরে ১০০টি শূন্য বসালে যে সংখ্যা হয়, তার একটা মজার নাম দাও। ছেলেটা বলল “googol”। শব্দের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ওয়ার্ড অরিজিন্স-এর গোগল শব্দের উৎস-বিষয়ক নথিতে কাসনারের নিজের লেখা বিবরণ উদ্ধৃত আছে।
গোগল থেকে গুগল হলো কীভাবে?
এই অংশটাই সবচেয়ে মজার। ধাপে ধাপে দেখা যাক:
- শুরুতে নাম ছিল ব্যাকরাব (BackRub)। ল্যারি পেজ আর সের্গেই ব্রিন তখন স্ট্যানফোর্ডের পিএইচডি শিক্ষার্থী। তাদের প্রযুক্তি ওয়েবসাইটের “ব্যাক লিংক” বিশ্লেষণ করত, তাই এই নাম।
- নতুন নামের খোঁজ। তারা এমন নাম চাইছিলেন, যেটা বিশাল পরিমাণ তথ্য সাজানোর ধারণাটা বোঝায়।
- এক সহপাঠীর প্রস্তাব। হোয়াইটবোর্ডের সামনে শিক্ষার্থী শন অ্যান্ডারসন বললেন “googolplex”। ল্যারি পেজ ছোট করে বললেন “googol”।
- টাইপো। অ্যান্ডারসন ডোমেইন খালি আছে কি না দেখতে গিয়ে ভুল করে “google.com” লিখে সার্চ দিলেন। ডোমেইনটা খালি পাওয়া গেল।
- নিবন্ধন। নামটা ল্যারি পেজের পছন্দ হলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখে ডোমেইনটা রেজিস্টার করে ফেললেন।
স্ট্যানফোর্ড কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ডেভিড কোলার সেই অফিসের সহপাঠীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ঘটনাটা লিখে রেখেছেন। শন অ্যান্ডারসনের স্মৃতি থেকে পাওয়া বিবরণও সেখানে আছে।
নামটা কীভাবে জন্ম নিল, ভিডিওতে দেখে নিন। ২-৩ মিনিটেই পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
গোগল সংখ্যাটা আসলে কত বড়?
গোগল মানে ১০-এর ১০০ ঘাত। কয়েকটা তুলনা দিলে আন্দাজ পাওয়া যাবে:
- পদার্থবিজ্ঞানীদের আনুমানিক হিসাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে পরমাণু আছে প্রায় ১-এর পরে ৮০টি শূন্য সংখ্যক। গোগল তার চেয়েও প্রায় ১-এর পরে ২০টি শূন্য গুণ বড়।
- গণিতে গোগলের বিশেষ কোনো ব্যবহার নেই। কাসনার এটা বানিয়েছিলেন অনেক বড় সংখ্যা আর অসীমের পার্থক্য বোঝাতে।
- এর চেয়ে বড় আরেকটা নামের কথা নিচে FAQ অংশে বলা আছে: গুগলপ্লেক্স।
গুগল নামের সাথে কাজের মিল কোথায়?
গোগল মানে বিশাল সংখ্যা, আর গুগলের কাজ বিশাল তথ্যভান্ডার সামলানো। গুগলের সার্চ তিনটা ধাপে কাজ করে:
- ক্রলিং: গুগলের সফটওয়্যার (গুগলবট) ওয়েবের পাতায় পাতায় ঘুরে নতুন পাতা খুঁজে বের করে।
- ইনডেক্সিং: পাওয়া পাতাগুলো বিষয় অনুযায়ী এক বিশাল তালিকায় সাজিয়ে রাখা হয়, অনেকটা লাইব্রেরির ক্যাটালগের মতো।
- র্যাঙ্কিং: আপনি কিছু সার্চ করলে সেই তালিকা থেকে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক পাতাগুলো সাজিয়ে সামনে আনা হয়। সাধারণত এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে।
কাগজে ১-এর পর মাত্র ২০-৩০টা শূন্য লিখতেই ক্লান্ত লাগে। সেখানে ১০০টা শূন্য কতটা বিশাল, সেটা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
এই বিষয়ে বিভিন্ন লেখা ঘেঁটে আমার সবচেয়ে চমকপ্রদ লেগেছে একটা জিনিস। নামটা বানানোর সময় কেউ ব্র্যান্ডিংয়ের কথা ভাবেননি। একটা টাইপোই পরে পুরো ব্র্যান্ডের পরিচয় হয়ে গেছে।
বাংলা ভাষায় “গুগল” শব্দটা কীভাবে কাজ করে?
গুগল শব্দটা বিশেষ্য না ক্রিয়া?
দুটোই। বিশেষ্য হিসেবে “গুগল” একটি প্রতিষ্ঠানের নাম, মানে নামবাচক বিশেষ্য। তাই এর আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ নেই, ঠিক যেমন অন্য যেকোনো কোম্পানির নামের নেই।
ক্রিয়া হিসেবে “গুগল করা” এখন চলতি বাংলায় বহুল ব্যবহৃত। এর মানে গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে ইন্টারনেটে কিছু খোঁজা। ইংরেজিতেও “google” এখন ক্রিয়াপদ হিসেবে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে আছে।
গুগলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মজার চমক
গুগলের প্রকৌশলীরা সার্চে কিছু মজার “ইস্টার এগ” রেখেছেন। এগুলো সময়ের সাথে বদলাতে বা বন্ধ হতে পারে, তাই নিজে পরীক্ষা করে দেখুন:
- do a barrel roll লিখে সার্চ করলে সার্চ পেজটা একবার ঘুরে যায়। একজন প্রকৌশলী এটা বানিয়েছিলেন ব্যবহারকারীদের মজা দিতে, আর আধুনিক ব্রাউজারের CSS ক্ষমতা দেখাতে।
- askew বা tilt লিখলে পেজটা একদিকে কাত হয়ে যায়।
- গুগল স্ট্রিট ভিউতে “Susan’s Garage” নামে সেই গ্যারেজ ঘুরে দেখা যায়, যেখানে ল্যারি পেজ আর সের্গেই ব্রিন গুগলের শুরুর কাজ করেছিলেন। এমন আরও কিছু চমক পাবেন এই তালিকায়।
গুগলের মূল কোম্পানির নাম অ্যালফাবেট কেন?
গুগল এখন শুধু সার্চ ইঞ্জিন নয়। ইউটিউব, অ্যান্ড্রয়েডসহ অনেক সেবা এর ছাতার নিচে আছে। এসব সেবার মূল প্রতিষ্ঠানের নাম অ্যালফাবেট (Alphabet)।
কোম্পানি ঘোষণার সময় ল্যারি পেজ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, অ্যালফাবেট মানে বর্ণমালা। ভাষা মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটা, আর সার্চের তথ্য সাজানোর কাজও ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে। নামটা তাঁর পছন্দের আরেকটা কারণ ছিল “আলফা-বেট” ধারণা, অর্থাৎ বিনিয়োগে গড়ের চেয়ে বেশি রিটার্ন।
মিথ বনাম বাস্তবতা
| প্রচলিত ধারণা | বাস্তবতা |
|---|---|
| গুগল একটি লম্বা ইংরেজি বাক্যের সংক্ষিপ্ত রূপ (“Global Organization of Oriented Group Language of Earth” জাতীয়) | নির্ভরযোগ্য সূত্রে এর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। নামটা গোগল শব্দের বানান-ভুল রূপ বলেই বেশিরভাগ বিবরণে আছে |
| গুগলের একটা নির্দিষ্ট বাংলা অর্থ আছে | এটি বিশেষ নাম। ক্রিয়া হিসেবে “গুগল করা” মানে ইন্টারনেটে খোঁজা |
| গুগল আর গোগল একই জিনিস | গোগল একটা সংখ্যার নাম, গুগল একটা কোম্পানি ও ব্র্যান্ড |
গুগল নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
গুগলের পূর্ণরূপ কি?
গুগলের কোনো আসল পূর্ণরূপ নেই। এটি গোগল শব্দের বানান-ভুল রূপ, আর ইন্টারনেটে ঘোরা লম্বা পূর্ণরূপগুলো পরে বানানো বলে মনে হয়।
গুগল কোম্পানির নাম কি?
কোম্পানির নাম গুগল (Google)। এটি এখন আলফাবেট নামের মূল প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করে।
গোগল আর গুগলের বানান আলাদা কেন?
ডোমেইন খালি আছে কি না দেখতে গিয়ে শন অ্যান্ডারসন ভুল করে “google” লিখে ফেলেছিলেন। ডোমেইনটা খালি ছিল আর নামটা পছন্দ হয়েছিল, তাই সেটাই রাখা হয়।
গুগলপ্লেক্স মানে কী?
গুগলপ্লেক্স (googolplex) মানে ১-এর পরে গোগল সংখ্যক শূন্য। এটা এত বড় যে সাধারণ কাগজে লিখে শেষ করা অসম্ভব। গুগলের সদর দপ্তরের নাম “গুগলপ্লেক্স” এই শব্দ থেকেই এসেছে।
“গুগল করা” মানে কী?
“গুগল করা” মানে গুগল সার্চ ইঞ্জিনে কোনো তথ্য খোঁজা। এখন যেকোনো সার্চ ইঞ্জিনে খোঁজার ক্ষেত্রেও অনেকে কথাটা ব্যবহার করেন।
একটা ভুল বানান, আর তার পেছনের বিশাল কাহিনি
সংক্ষেপে যা জানলেন: গুগল একটি বিশেষ নাম, যার আক্ষরিক অর্থ নেই। এটি এসেছে গোগল থেকে, মানে ১-এর পরে ১০০টি শূন্য। নয় বছরের এক ছেলের বানানো শব্দ, এক শিক্ষার্থীর টাইপো আর দুই গবেষকের পছন্দ মিলে আজকের গুগল তৈরি হয়েছে।
আমি এই গল্পটা যাকেই বলেছি, প্রথম প্রতিক্রিয়া একই ছিল: “সত্যি?” এবার আপনিও কাউকে একটু চমকে দিয়ে দেখুন। আর চারপাশের চেনা শব্দগুলোরও যে একটা করে গল্প আছে, সেটা একবার খুঁজে দেখবেন।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!









