ছোট বোনের এনআইডি করাতে গিয়ে যা জানলাম
গত মাসে আমার ছোট বোনের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় একটা সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। রেজিস্ট্রেশন কার্ডে তার নাম আর জন্মনিবন্ধনের নামের বানানে ছোট একটা অমিল ছিল। স্কুল থেকে জানানো হলো, এনআইডি থাকলে তথ্য যাচাই খুব সহজে করা যেত।
তখনই প্রথম জানলাম, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বর্তমান নিয়মে এখন ১৬ বা ১৭ বছর বয়সীরাও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেতে পারে। অনেকেই এখনো মনে করেন ১৮ বছর না হলে এনআইডি পাওয়া যায় না — কিন্তু এই ধারণাটি এখন আর সঠিক নয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: বাংলাদেশে এখন ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী নাগরিকরা এনআইডি-র জন্য আবেদন করতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি ফটোকপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ঠিকানার প্রমাণপত্র এবং নাগরিকত্ব সনদ। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট (services.nidw.gov.bd)-এ ফরম পূরণ করে নিকটস্থ উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে বায়োমেট্রিক দিলেই এনআইডি পাওয়া যায়। ১৮ বছর পূর্ণ হলে ভোটাধিকার নিজে থেকেই কার্যকর হয়ে যায়।
কেন ১৬-১৭ বছর বয়সীদের জন্য এনআইডি এত জরুরি হয়ে উঠেছে
এতদিন ১৮ বছরের নিচে সরকারি পরিচয়ের একমাত্র মাধ্যম ছিল জন্মনিবন্ধন সনদ। কিন্তু ডিজিটাল সেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় যথেষ্ট হয় না।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে: এসএসসি/এইচএসসি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিট কার্ড, বৃত্তি ও পরীক্ষার ডেটাবেজে তথ্য মেলানোর জন্য।
- ই-পাসপোর্ট আবেদনে: নিজস্ব এনআইডি থাকলে তথ্য যাচাই ও ভেরিফিকেশন অনেক সহজ হয়।
- ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে: নিজের নামে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট বা বৃত্তির টাকা তোলার জন্য।
- সিম নিবন্ধনে: অভিভাবকের ওপর নির্ভর না করে নিজের নামে সিম তোলার সুবিধা।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইনের আলোকে নির্বাচন কমিশন এই সুযোগ চালু করেছে, যাতে ১৮ বছর হওয়ার আগেই তরুণদের একটা স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরি হয়।

আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা
অফিসে গিয়ে কাগজ কম থাকার কারণে যেন ঘুরে আসতে না হয়, সেজন্য আগে থেকেই এগুলো রেডি রাখুন:
- ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ — হাতে লেখা সনদ গ্রহণযোগ্য নয়।
- পিতা ও মাতার এনআইডির স্পষ্ট ফটোকপি। কারো বাবা বা মা প্রয়াত হলে, বা পিতা-মাতার বিচ্ছেদ থাকলে সেক্ষেত্রে কী কাগজ লাগবে তা এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে — এমন পরিস্থিতিতে আবেদনের আগে একবার নিজের উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে ফোন করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ বা অ্যাডমিট কার্ড — জেএসসি/এসএসসি বা সমমান, বয়স ও নামের প্রমাণ হিসেবে।
- ঠিকানার প্রমাণ — বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির সাম্প্রতিক বিলের কপি, অথবা হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ।
- নাগরিকত্ব সনদ — ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র।
- রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার রিপোর্ট — যেকোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল স্লিপ।
প্রো টিপ: বিদ্যুৎ বিলের ঠিকানা ও জন্মনিবন্ধনের ঠিকানায় যেন কোনো বড় অমিল না থাকে — যেমন এক জায়গায় “রোড” আরেক জায়গায় “সড়ক”, বা ভুল ওয়ার্ড নম্বর। নিজে এই ভুলের ভুক্তভোগী হয়ে দেখেছি, ছোট এই অমিলের জন্যও নির্বাচন অফিস ফাইল ফেরত দিয়ে দিতে পারে।
অনলাইনে আবেদন ও বায়োমেট্রিক দেওয়ার নিয়ম
পুরো প্রক্রিয়া দুই ধাপে সম্পন্ন হয় — অনলাইন ফরম পূরণ, এরপর অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন।
- বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল NID পোর্টালে গিয়ে নতুন নিবন্ধনের জন্য অ্যাকাউন্ট খুলুন।
- ভোটার নিবন্ধন ফরম নির্ভুলভাবে পূরণ করুন — নিজের ও পিতা-মাতার নামের বানান জন্মনিবন্ধনের সাথে হুবহু মিলিয়ে লিখুন।
- আবেদন সাবমিট করার পর ফরমটি ডাউনলোড করে এপিঠ-ওপিঠ (এক পাতার দুই পাশে) প্রিন্ট করুন।
- প্রিন্ট করা ফরমে চেয়ারম্যান/কাউন্সিলরের স্বাক্ষর ও নিজের সই নিন।
- সব কাগজপত্রের ফটোকপিসহ ফরমটি নিজের এলাকার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে সশরীরে জমা দিন।
- অফিসে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিস স্ক্যান সম্পন্ন করুন।
পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটা চোখের সামনে দেখে নিতে চাইলে এই ভিডিওটা দেখতে পারেন —
বায়োমেট্রিক শেষ হলে একটা ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে। যাচাই-বাছাই শেষে মোবাইলে এসএমএস এলে NID Wallet অ্যাপ দিয়ে ফেস ভেরিফিকেশন করে অনলাইন থেকে রঙিন কপি ডাউনলোড করে নেওয়া যায়, ল্যামিনেট করে সাথে সাথে ব্যবহারও শুরু করা যায়।
১৬-১৭ বছরের এনআইডি বনাম ১৮+ ভোটার আইডি: মূল পার্থক্য
| বিষয় | ১৬-১৭ বছর বয়সীদের এনআইডি | ১৮+ প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটার আইডি |
|---|---|---|
| ভোটাধিকার | ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই | সরাসরি নির্বাচনে ভোট দেওয়া যায় |
| ব্যবহারিক ক্ষেত্র | ব্যাংক, পাসপোর্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিম নিবন্ধন | পরিচয় ও ভোটাধিকার উভয়ই |
| ১৮ বছর পূর্ণ হলে | তালিকায় নাম নিজে থেকেই যুক্ত হয় | শুরু থেকেই তালিকাভুক্ত থাকে |
| আবেদনের প্ল্যাটফর্ম | services.nidw.gov.bd | services.nidw.gov.bd |

আবেদনের সময় যেসব ভুল মানুষ সবচেয়ে বেশি করে
- শেষ মুহূর্তে আবেদন করা: বায়োমেট্রিক শেষ হয়ে অনুমোদন পেতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। কোনো জরুরি ডেডলাইনের অন্তত এক মাস আগে আবেদন শুরু করা উচিত।
- ভুল মোবাইল নম্বর দেওয়া: অনুমোদনের এসএমএস এই নম্বরেই আসে। সবসময় নিজের বা অভিভাবকের নিয়মিত ব্যবহৃত নম্বর দিন।
- কাউন্সিলর প্রত্যয়নপত্রে অস্পষ্ট সিল-স্বাক্ষর: এটা যাচাইয়ের সময় আবেদন আটকে দিতে পারে।
- তথ্যে অমিল রেখে জমা দেওয়া: জন্মনিবন্ধন, শিক্ষা সনদ ও ঠিকানার প্রমাণে নাম-ঠিকানা না মিললে ফাইল ফেরত আসার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
এই ভুলগুলো এড়িয়ে চললে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়, যদিও এলাকাভেদে যাচাই প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময়ের তারতম্য থাকতেই পারে।
এই বিষয়ে সাধারণত যে প্রশ্নগুলো আসে
১৬ বছর বয়সে এনআইডি করালে কি সাথে সাথে ভোট দেওয়া যাবে?
না। এনআইডি হাতে পেলেও ভোটাধিকার ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কার্যকর হয় না। ১৮ বছর হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়ে যায়।
অনলাইন থেকে সাময়িক কার্ড কীভাবে ডাউনলোড করব?
মোবাইলে অনুমোদনের এসএমএস এলে স্লিপ নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে পোর্টালে রেজিস্টার করুন। এরপর NID Wallet অ্যাপ দিয়ে ফেস ভেরিফিকেশন করলেই কালার কপি ডাউনলোড করা যায়।
নতুন নিবন্ধনের জন্য কোনো সরকারি ফি লাগে কি?
না, নতুন ভোটার বা এনআইডি নিবন্ধন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়।
জন্মনিবন্ধন সনদ হাতে না থাকলে কি আবেদন করা যাবে?
না, ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য হয় না। আগে সেটা ডিজিটাল আকারে সংগ্রহ করে নিতে হবে।
বাবা-মায়ের এনআইডিতে ভুল থাকলে সন্তানের আবেদনে সমস্যা হবে কি?
বাবা-মায়ের এনআইডির নাম ও সন্তানের জন্মনিবন্ধনে থাকা পিতা-মাতার নামে বড় অমিল থাকলে সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগে পিতা-মাতার এনআইডি সংশোধন করে নেওয়াই ভালো।
আজ থেকেই যা করা যায়
পরিবারে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সী কেউ থাকলে, ১৮ বছর হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে এখনই এনআইডি করিয়ে রাখা ভালো। এতে পাসপোর্ট তৈরি, উচ্চশিক্ষার আবেদন কিংবা বিভিন্ন সরকারি সেবায় ভবিষ্যতের অনেক ভোগান্তি আগেভাগেই এড়ানো যায়। কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে আজই নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করে দিন।
নিয়মকানুন মাঝেমধ্যে হালনাগাদ হয়, তাই আবেদনের আগে একবার নিজের এলাকার নির্বাচন অফিসে ফোন করে সর্বশেষ কাগজপত্রের তালিকাটা যাচাই করে নিলে অযথা ঘোরাঘুরি এড়ানো যায়।








