দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে আমদানি করা মাল্টার গড় আমদানি মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৮৭ টাকা। অথচ ৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজারে সেই মাল্টা বিক্রি হয়েছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে দাম বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি।
এক নজরে
- মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশ তৈরি হচ্ছে আমদানি পর্যায়ের করেই।
- সরবরাহ কম থাকা ও ডেঙ্গুর চাহিদায় পাইকারি-খুচরায় দাম আরও চড়েছে।
- চট্টগ্রামে বাজারে অভিযান চলছে।
মাল্টার দামের হিসাব: কোন ধাপে কত
- আমদানি মূল্য: প্রায় ৮৭ টাকা
- শুল্ক-কর: প্রায় ১০৭ টাকা (খালাসের সময় ব্যয় ১৯৩ থেকে ১৯৪ টাকা)
- বন্দর থেকে গুদাম, কনটেইনার ও পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক ব্যয়: ১০ থেকে ১৫ টাকা (মোট ২০৪ থেকে ২০৯ টাকা)
- আমদানিকারকদের দাবি করা প্রকৃত ব্যয়: ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা
- পাইকারি দাম (সর্বোচ্চ সময়ে): ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা
- খুচরা দাম: ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা
ফল আমদানিতে শুল্কের হার কত
বাংলাদেশ কাস্টমসের হিসাবে, কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। পাঁচ স্তরে এই কর আদায় হয়: আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর।
আমদানিকারকরা বলছেন, পচনশীল পণ্যে এই হিসাবই শেষ কথা নয়। ফল নষ্ট হওয়া, কনটেইনার ও বন্দরসংক্রান্ত খরচ ধরলে তাঁদের প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি দাঁড়ায়।
আমদানি করা ফলে সব সময় এত কর ছিল না। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টাসহ কয়েকটি ফলের মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ। ডলার-সংকটের মধ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালের মে মাসে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসে।
পরে করভার আরও বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একপর্যায়ে ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশে ওঠে। এরপর কিছুটা কমিয়ে এখন কমলা, মাল্টা, আপেল ও আঙুরের মতো ফলে তা ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ফলে বিদেশে দাম না বাড়লেও শুধু করকাঠামোর কারণে দেশে ঢোকার আগেই মাল্টার দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাচ্ছে।
আমদানি কমছে ধারাবাহিকভাবে
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক-কর বাড়ানোর পর থেকে মাল্টা আমদানি টানা কমেছে:
| অর্থবছর | মাল্টা আমদানি (টন) |
|---|---|
| ২০২১-২২ | ২ লাখ ৯৪ হাজার |
| ২০২২-২৩ | ২ লাখ ২০ হাজার |
| ২০২৩-২৪ | ১ লাখ ৭৩ হাজার |
| ২০২৪-২৫ | ১ লাখ ৬৮ হাজার |
| ২০২৫-২৬ | ১ লাখ ৫৩ হাজার |
চার বছরের ব্যবধানে আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রায় তিন মাসে এসেছে মাত্র ২১ হাজার টন।
চট্টগ্রামের ফলের বাজারে পাইকারি থেকে খুচরা
চট্টগ্রামের ফলমন্ডির ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে পাইকারিতে মাল্টা বিক্রি হয়েছিল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি। এরপর দ্রুত দাম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ১৫ কেজির কার্টন বিক্রি হয় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায়।
মাল্টা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচআর করপোরেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বলেন, শুল্ক-কর, বন্দর মাশুল ও কনটেইনার পরিবহনসহ সব খরচই বেড়েছে। তবে তাঁর ভাষ্য, আমদানিকারক বা পাইকারি পর্যায়ের দামের তুলনায় খুচরায় অনেক ক্ষেত্রে কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগীর ফলের দাম বাড়ল কেন
রেলওয়ে মেন্স সুপার মার্কেটের ফল ব্যবসায়ী মো. বাবুল জানান, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমদানিকারকদের অনেকে লোকসান করেছেন। ফলে পরে আমদানি কমে যায়। সেপ্টেম্বরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম দ্রুত বেড়েছে।
একই সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন এবং মারা গেছেন ২৪৫ জন। সেপ্টেম্বরেই রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বর ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের পরিবারে মাল্টা ও কমলার মতো ফল কেনার প্রবণতা বেড়েছে। সরবরাহ কম থাকার সময়ে সেই বাড়তি চাহিদাই দাম আরও ওপরে তুলেছে।
বাবুল জানান, এখন নতুন চালান আসায় দাম কমতে শুরু করেছে। সরবরাহ আরও বাড়লে দাম আরও কমতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
বাজারে অভিযান
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে এবং ইতিমধ্যে বাজারে অভিযান চালানো হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার ফলমন্ডিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে অভিযান চলবে।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!








