বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি পাউরুটি, কেক ও বিস্কুটসহ বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, নতুন দর আগামী সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে এবং তা ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে। কাঁচামাল ও জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি এবং চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংক্ষেপে মূল তথ্য:
- সিদ্ধান্ত: বেকারি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি
- সিদ্ধান্তদাতা: বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি
- সম্ভাব্য কার্যকর সময়: ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে, নতুন দর ঘোষণা আগামী সপ্তাহে
- কারণ: ময়দা-চিনি-ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত
কাঁচামালের দাম কতটা বেড়েছে
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে খুচরায় প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৫ শতাংশ এবং চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। সাম্প্রতিক বাজার পর্যবেক্ষণেও এই ধারা অব্যাহত আছে — গত দুই সপ্তাহে প্রতি কেজি চিনির দাম আরও প্রায় ১০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১১৫-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে, ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা এখন কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়, বছরখানেক আগে যা ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। একইভাবে বস্তাপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা, ডালডার ১৬ কেজির কার্টনে ৮০০ টাকা এবং সয়াবিন তেলের ১৮৫ কেজির ড্রামে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট। প্রায় দুই বছর ধরে চলা গ্যাসের সমস্যার পাশাপাশি গত এক মাসে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও খারাপ হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। নিয়মিত লোডশেডিংয়ে ইলেকট্রিক ওভেনে থাকা পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলে অনেক কারখানা এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের মতো বিকল্প ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যাতে উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন
রাজধানীর মালিবাগের কাকলি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুটের স্বত্বাধিকারী আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, তাঁর কারখানায় একদিনেই প্রায় ১৮ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে বলে হিসাব করে দেখেছেন। মোহাম্মদপুরের মধুমিতা ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরির কর্ণধার বোরহান উদ্দিনও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন, তাঁর মতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারে খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকঋণ বাড়ছে।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার, যার মধ্যে ঢাকায় ৭০০টির বেশি। এই খাতে সরাসরি প্রায় ২৫ লাখের বেশি মানুষ যুক্ত। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে এই বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সমিতির ভাষ্যমতে, গত কয়েক মাসে রাজধানীতে অর্ধশতাধিক বেকারি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়নি, বলছেন সমিতি
দাম বাড়ানোর আগে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন জানান, তেল-ময়দা-চিনির দাম বাড়ানোর সময় সরকারের স্টেকহোল্ডাররা তাঁদের সঙ্গে বসেননি। তাঁর ভাষ্যে, এই ক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে সরকারি পর্যায়ে তেমন মনোযোগ নেই এবং কোনো অনুদানও পাওয়া যায় না, তাই দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সমিতিকেই নিতে হচ্ছে।
নিয়মিত বিদ্যুৎ বিলের চাপ এমনিতেই ছোট কারখানার খরচ বাড়িয়ে রেখেছিল, তার ওপর সাম্প্রতিক লোডশেডিং পরিস্থিতি ব্যবসাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ
দাম বৃদ্ধির খবরে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন স্বল্প আয়ের মানুষ, যাদের কাছে চা-রুটি নিত্যদিনের সস্তা নাশতা। রাজধানীর রামপুরা এলাকার রিকশাচালক হান্নান মিয়া জানিয়েছেন, দিন দিন রুটির আকার ছোট হয়ে আসছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে। কারওয়ানবাজারের শ্রমিক শাহ আলম সাজুও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তাঁর মতে দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবেন খেটে খাওয়া মানুষেরাই।
অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি মনে হলে ক্রেতারা ভোক্তা অধিকার আইনে অভিযোগ করার সুযোগও রাখেন।
চট্টগ্রামেও একই সংকট
শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রামের ছোট ও মাঝারি বেকারিগুলোও একই ধরনের সংকট মোকাবিলা করছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সেখানেও ওভেন চালানো ও নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, আর বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার হাজারো বেকারি ও কনফেকশনারি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমিতির ঘোষণা অনুযায়ী নতুন দর এখনো চূড়ান্তভাবে প্রকাশ পায়নি, আর সরকারের কোনো পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। আগামী সপ্তাহের ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে বাজারে বেকারি পণ্যের দাম ঠিক কতটা বাড়ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!










