বাইক বা গাড়ি চালানো শিখছেন, কিন্তু লাইসেন্সের কথা উঠলেই মাথায় আসে অফিসের দৌড়ঝাঁপ আর খরচের অনিশ্চয়তা। অথচ ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রথম ধাপ, শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন, ঘরে বসেই বিআরটিএ-র অনলাইন পোর্টালে করা যায়।
এই লেখায় ফি, কাগজপত্র আর আবেদনের ধাপগুলো একসাথে পাবেন।
এক নজরে
- আবেদন: বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে (বিএসপি) অনলাইনে
- ফি: এক ক্যাটাগরির জন্য ৫১৮ টাকা, দুই ক্যাটাগরির জন্য ৭৪৮ টাকা
- প্রধান কাগজ: এনআইডি, শিক্ষাগত সনদ ও রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর
- পরের ধাপ: প্রশিক্ষণ ও নির্ধারিত পরীক্ষা
আবেদনের আগে কী নিয়ে বেশি বিভ্রান্তি হয়?
অনেকেই প্রথমে বুঝতে পারেন না, শিক্ষানবিশ আর লার্নার লাইসেন্স এক কি না। ফি নিয়ে এক এক জায়গায় এক এক কথা শুনে বিভ্রান্ত হন। আবার কাগজপত্র পুরো না থাকলে আবেদনের মাঝপথেই কাজ আটকে যায়।
নিচের অংশগুলোতে এই তিনটি প্রশ্নেরই উত্তর আছে।
শিক্ষানবিশ আর লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স কি একই?
হ্যাঁ, একই। বিআরটিএ-র ফরমে “শিক্ষানবিশ” লেখা থাকে, আর সাধারণ মানুষ বলে “লার্নার”।
এটা স্থায়ী লাইসেন্সের আগের ধাপ। বিআরটিএ-র তথ্য অনুযায়ী লার্নার লাইসেন্স থাকা স্থায়ী লাইসেন্সের পূর্বশর্ত। প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার ধাপ নিয়ে এই ক্লাস্টারের পরের পোস্টগুলোতে আলাদা করে লিখব।
কারা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন?
বিআরটিএ-র ড্রাইভিং লাইসেন্স পেজের তথ্য অনুযায়ী শর্তগুলো এরকম:
| বিষয় | শর্ত |
|---|---|
| বয়স (অপেশাদার লাইসেন্স) | কমপক্ষে ১৮ বছর |
| বয়স (পেশাদার লাইসেন্স) | কমপক্ষে ২১ বছর |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস |
| স্বাস্থ্য | শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ |
শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের কাগজপত্র কী কী লাগে?
তালিকা ছোট। শুরু করার আগে এগুলো জোগাড় করে রাখলে মাঝপথে থামতে হয় না।
| কাগজ | কেন লাগে | ফরম্যাট |
|---|---|---|
| জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) | অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন ও পরিচয় | স্ক্যান কপি |
| শিক্ষাগত সনদ | শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ | স্ক্যান কপি |
| রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর | ওটিপি যাচাই | নম্বরটি চালু ও আপনার হাতে থাকতে হবে |
আবেদন ফরমে অন্য কোনো তথ্য বা নথি চাইলে সেটাও দিতে হবে।
স্ক্যান কপি কীভাবে তৈরি করবেন?
পোর্টালে কাগজ আপলোডের ধাপে এসে অনেকেই আটকে যান, কারণ স্ক্যান কপি তখনও তৈরি থাকে না। আগে থেকে ঠিক করে রাখলে এই ঝামেলা এড়ানো যায়।
- কাগজ সমতল জায়গায় রেখে ছবি তুলুন বা স্ক্যানার অ্যাপ ব্যবহার করুন। চারটি কোণই যেন দেখা যায়।
- আলো এমনভাবে রাখুন যেন লেখায় ছায়া না পড়ে।
- এনআইডি ও সনদ আলাদা আলাদা ফাইলে রাখুন। ফাইলের নাম চেনা যায় এমন দিন, যেমন “nid” আর “sonod”।
- আপলোডের জায়গায় ফাইলের ধরন ও আকার নিয়ে যে নির্দেশনা লেখা থাকে, তার মধ্যে থাকুন।
এনআইডি আর সনদের নাম ও জন্মতারিখ মিলিয়ে দেখুন। গরমিল থাকলে আবেদনের আগেই ঠিক করে নেওয়া ভালো। জন্ম নিবন্ধনের তথ্যে ভুল থাকলে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের নিয়ম কাজে আসবে। নিবন্ধনের তথ্য ঠিক আছে কি না দেখতে চাইলে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ের পদ্ধতি দেখে নিন।
লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স ফি কত?
ফি নির্ভর করে কয়টি ক্যাটাগরির জন্য আবেদন করছেন তার ওপর:
| ক্যাটাগরির সংখ্যা | উদাহরণ | ফি |
|---|---|---|
| ১ ক্যাটাগরি | শুধু মোটরসাইকেল অথবা শুধু কার | ৫১৮ টাকা |
| ২ ক্যাটাগরি | মোটরসাইকেল ও হালকা মোটরযান একসাথে | ৭৪৮ টাকা |
সূত্র: বিআরটিএ-র অফিসিয়াল ড্রাইভিং লাইসেন্স ফি পেজ। ফি পরিবর্তন হতে পারে, তাই পোর্টালে আবেদনের সময় যে অঙ্ক দেখাবে সেটাই চূড়ান্ত ধরবেন। ভ্যাট বা অন্য চার্জ আলাদা আছে কি না, সেটাও ওখানে দেখে নিন।
নিজের জন্য কয়টি ক্যাটাগরি বাছবেন?
ফি-র অঙ্ক ক্যাটাগরির সংখ্যার সাথে বদলায়, তাই আবেদনের আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা ভালো। তিনটি প্রশ্ন নিজেকে করুন।
- এখন কোন যান চালাবেন? শুধু বাইক চালালে মোটরসাইকেলের ক্যাটাগরি, শুধু গাড়ি চালালে কারের ক্যাটাগরি।
- কাছাকাছি সময়ে দুটোই চালানোর সম্ভাবনা আছে কি? থাকলে দুই ক্যাটাগরি একসাথে নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন।
- পরিবারের কেউ শেখাতে বা শেখার জন্য গাড়ি দিচ্ছে কি? যে যানে শেখার সুযোগ আছে, সেটার ক্যাটাগরিই আগে ঠিক করুন।
পরে আলাদাভাবে ক্যাটাগরি যোগ করতে চাইলে কী নিয়ম ও ফি লাগবে, তা আমার সোর্সে নেই। এটা পোর্টাল বা বিআরটিএ-র অফিসিয়াল পেজে যাচাই করে নেবেন।
অনলাইনে শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করবেন কীভাবে?
বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলে লার্নার লাইসেন্সের অপশনে তথ্য ও কাগজ দিন, তারপর অনলাইনে ফি দিন। ধাপগুলো আলাদা করে দেখে নিন।
পোর্টালে ধাপগুলো দেখতে কেমন, নিচের ভিডিওতে দেখে নিন।
অ্যাকাউন্ট খুলুন
বিআরটিএ-র অফিসিয়াল সার্ভিস পোর্টালে গিয়ে নিবন্ধন (Register) অপশন বেছে নিন। এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর দিন।
এনআইডি-তে যেভাবে লেখা আছে, ঠিক সেভাবেই তথ্য দেবেন।
ওটিপি যাচাই করে লার্নার অপশনে ঢুকুন
আপনার মোবাইলে একটি ওটিপি যাবে। সেটা দিয়ে অ্যাকাউন্ট যাচাই করুন। এরপর ‘লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স’ অপশনে ঢুকুন। বিআরটিএ-র অনলাইন আবেদনের পেজেও নির্দেশনা আছে।
তথ্য পূরণ ও কাগজ আপলোড
ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য দিন, তারপর স্ক্যান করা কাগজপত্র আপলোড করুন। ফরমের কাঠামো আগে দেখতে চাইলে বিআরটিএ-র শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের আবেদন ফরমের পেজ খুলে দেখতে পারেন।
জমা দেওয়ার আগে পুরো ফরমটা একবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে নিন। নাম, জন্মতারিখ ও ক্যাটাগরি, এই তিনটি ঠিক আছে কি না আলাদা করে দেখুন।
অনলাইনে ফি দিন
নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করুন। পোর্টাল যে পেমেন্ট অপশন দেখায়, শুধু সেটাই ব্যবহার করুন।
পেমেন্ট শেষ হলে পর্দায় যা দেখাবে, তার স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন। পরে কোনো প্রশ্ন উঠলে এটা প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর কী করবেন?
বিআরটিএ-র তথ্য অনুযায়ী আবেদন সফলভাবে জমা হলে পোর্টাল থেকে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট করা যায়। প্রিন্ট করা কপি আর আবেদনের তথ্য সংরক্ষণ করে রাখুন। আবেদনের অবস্থা পোর্টালের স্ট্যাটাস থেকে দেখে নিন।
পোর্টালে লার্নার লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের সেবাও আছে।
পোর্টালে আটকে গেলে প্রাথমিকভাবে কী দেখবেন?
ওটিপি না এলে বা লগইনে সমস্যা হলে আগে নিজের দিকটা মিলিয়ে নিন।
- নিবন্ধনের সময় যে নম্বর দিয়েছিলেন, ঠিক সেই নম্বরেই এসএমএস আসছে কি না দেখুন।
- মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঠিক আছে কি না, আর বার্তার ইনবক্সে ওটিপি এসে অন্য ফোল্ডারে চলে গেছে কি না দেখুন।
- বারবার চাপ না দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করুন।
- ওটিপি কাউকে বলবেন না। সাহায্য করার কথা বলে কেউ ওটিপি চাইলেও না।
এতেও না মিটলে বিআরটিএ-র অফিসিয়াল যোগাযোগ মাধ্যমে জানান।
লার্নার লাইসেন্স নিয়ে চালু কিছু ভুল ধারণা
| ভুল ধারণা | বাস্তবতা |
|---|---|
| লার্নার লাইসেন্স পেলেই স্থায়ী লাইসেন্স হয়ে গেল | এটা স্থায়ী লাইসেন্সের পূর্বশর্ত মাত্র। এরপর প্রশিক্ষণ ও নির্ধারিত পরীক্ষা আছে |
| অনলাইনে আবেদন নিজে পারা যায় না, কাউকে ধরতে হয় | বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিবন্ধন, আবেদন ও ফি পরিশোধ নিজেই করা যায় |
| ফি সবার জন্য এক অঙ্ক | ক্যাটাগরির সংখ্যা অনুযায়ী ফি আলাদা |
আবেদনে যেসব ভুল ও ফাঁদ এড়াবেন

- দালাল: “সব করে দেব” ধরনের কথায় সাড়া দেবেন না। নিজে আবেদন করলে কত ফি দিলেন, তার হিসাব আপনার হাতেই থাকে।
- ভুয়া ওয়েবসাইট: এনআইডি বা মোবাইল নম্বর দেওয়ার আগে ঠিকানা মিলিয়ে নিন। অফিসিয়াল পোর্টালের ঠিকানা
gov.bdদিয়ে শেষ হয়। - অন্যের মোবাইল নম্বর: ওটিপি আসবে রেজিস্টার্ড নম্বরে। নিজের নম্বর ব্যবহার করুন।
- ভুল ক্যাটাগরি: পরে আবার আবেদন করতে হতে পারে।
- ঝাপসা স্ক্যান: পরিষ্কার স্ক্যান কপি দিন।
শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
শিক্ষানবিশ ও লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স কি একই?
হ্যাঁ, একই। বিআরটিএ-র ফরমে “শিক্ষানবিশ” লেখা থাকে, সাধারণ মানুষ বলে “লার্নার”।
লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স ফি কত?
বিআরটিএ-র তথ্য অনুযায়ী এক ক্যাটাগরির জন্য ৫১৮ টাকা এবং দুই ক্যাটাগরির জন্য ৭৪৮ টাকা।
ঘরে বসে অনলাইনে আবেদন করা যায় কি?
হ্যাঁ, যায়। বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিবন্ধন করে অনলাইনেই আবেদন ও ফি পরিশোধ করা যায়।
লার্নার লাইসেন্সের জন্য কমপক্ষে কোন শ্রেণি পাস লাগে?
বিআরটিএ-র পেজ অনুযায়ী কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস লাগে। আবেদনের সময় শিক্ষাগত সনদ দিতে হবে।
১৮ বছরের কম বয়সে কি আবেদন করা যায়?
না। অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর, আর পেশাদার লাইসেন্সের জন্য ২১ বছর।
লার্নার লাইসেন্স কি নবায়ন করা যায়?
হ্যাঁ, বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে লার্নার লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের সেবা আছে। নবায়নের নিয়ম পোর্টালে দেখে নিন।
আবেদন জমা দেওয়ার আগে কোন তিনটি তথ্য আরেকবার দেখা উচিত?
নাম, জন্মতারিখ ও ক্যাটাগরি। এনআইডির সাথে প্রথম দুটো মিলিয়ে নিন, আর ক্যাটাগরি আপনার চালানোর যানের সাথে মিলছে কি না দেখুন।
প্রথম ধাপ শুরু করার আগে
- এনআইডি ও সনদের নাম-জন্মতারিখ মিলিয়ে দেখুন।
- দুটো কাগজের পরিষ্কার স্ক্যান কপি তৈরি রাখুন।
- কোন ক্যাটাগরির লাইসেন্স দরকার, তা ঠিক করে রাখুন।
- রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরটি চালু ও হাতের কাছে আছে কি না দেখুন।
আমি বিআরটিএ-র কর্মকর্তা নই। তাই আবেদনের আগে বিআরটিএ-র অফিসিয়াল পোর্টালে সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন, দরকার হলে নিকটস্থ সার্কেল অফিসে জেনে নিন।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!




