কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলগুলোতে রাত নামলেই পাল্টে যায় নদীর শান্ত রূপ। দিনের আলোতে বাজারে স্বাভাবিক বেচাকেনা চললেও রাত ২টার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ চক্র, যারা ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও নীলকমল নদ দিয়ে নৌকায় করে ভারতে পাচার করছে বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল—পাট। সীমান্তঘেঁষা এই বাণিজ্যের বিস্তারিত উঠে এসেছে সমকালের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
একনজরে পাচার পরিস্থিতির চিত্র
- জাহাজের আলগা, সাহেবের আলগা, নারায়ণপুর, পাখিউড়া, শৌলমারীসহ অন্তত এক ডজন চর থেকে দিনে পাট সংগ্রহ করে রাতে সীমান্ত পার করানো হয়
- সূত্রমতে প্রতি রাতে ১০-১২টি নৌকায় পাট যাচ্ছে ওপারে, মাসে যার পরিমাণ ৩০-৩৫ হাজার মণ
- বাংলাদেশে প্রতি মণ পাট ৩৮০০-৪২০০ টাকা, ভারতে একই পণ্য বিক্রি হচ্ছে ৫৫০০-৬০০০ টাকায়
- জলপথের ২০-২৫টি পয়েন্টে রাত নামলেই বাড়ে নৌযান চলাচল
- পাট অধিদপ্তর ও বিজিবি বলছে জনবল ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হচ্ছে
কীভাবে চলছে এই পাচার
সমকালের এক প্রতিবেদক সম্প্রতি মধ্যরাতে কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে পাটবাহী একটি নৌকার যাত্রী হয়ে এই চিত্র সরাসরি দেখেছেন। দিনের বেলা নদীপথে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক দেখালেও রাত গভীর হলেই বদলে যায় দৃশ্যপট।
কুড়িগ্রামের কচাকাটা, মাদারগঞ্জ, নুনখাওয়া, কাপনা, পদ্মারচরসহ বিভিন্ন চর থেকে দিনের বেলায় কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করা হয়। রাত ২টার পর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তোলা হয় সেই পাট, এরপর ভোর হওয়ার আগেই তা পৌঁছে যায় সীমান্তের ওপারে।
আরো খবর:
- অসুস্থতায় পরীক্ষা মিস করলেও গুনতে হবে জরিমানা, ক্ষুব্ধ বেরোবি শিক্ষার্থীরা
- রংপুর বিভাগে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনে ৮ জেলায় সোয়া কোটি টাকা জরিমানা
- রংপুরে সাংবাদিক উৎস হত্যা মামলার রায়: একজনের ফাঁসি, দুজনের যাবজ্জীবন
কেন ভারতে বিক্রি করছেন কৃষকেরা
দুই দেশের মূল্যের বড় ব্যবধানই এই বাণিজ্যের মূল কারণ বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
| বাংলাদেশে দাম (প্রতি মণ) | ভারতে দাম (প্রতি মণ) | |
|---|---|---|
| পাট | ৩৮০০-৪২০০ টাকা | ৫৫০০-৬০০০ টাকা |
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর নারায়ণপুরের এক কৃষক সমকালকে জানান, দেশের বাজারে সর্বোচ্চ যেখানে ৪২০০ টাকা মেলে, ওপারে একই পাট বিক্রি হচ্ছে ৬০০০ টাকা পর্যন্ত। প্রায় ১৮০০ টাকার এই ব্যবধানই ঝুঁকি সত্ত্বেও কৃষকদের আকৃষ্ট করছে বলে তার ভাষ্য।
চর শৌলমারীর আরেক কৃষকের বক্তব্য, নৌকা ভাড়া ও শ্রমিক খরচ বাদ দিলে দেশের বাজারে বিক্রিতে লাভ থাকে সামান্যই। তিনি জানান, ওপারের ক্রেতারা দিনের বেলায় বাড়িতে এসে ফসল দেখে দাম ঠিক করে যান, রাতে শুধু নৌকায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে বাড়তি ঝক্কি পোহাতে হয় না তাদের।
ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ও রাজস্ব হারানোর শঙ্কা
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সীমান্তের ওপারে এভাবে ফসল চলে যাওয়ায় তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জেলার সবচেয়ে বড় যাত্রাপুর হাটে সপ্তাহে দুই দিন সাধারণত চার-পাঁচ হাজার মণ পাট বেচাকেনা হতো, তবে গত এক মাসে তা কমে অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে বলে জানিয়েছেন হাটের বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, নৌপথে এভাবে ফসল চলে যাওয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি রাষ্ট্রও হারাচ্ছে সম্ভাব্য রাজস্ব। আরেক ব্যবসায়ী শাহানুর ইসলাম বলেন, ভারত চাইলে বৈধ পথে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাট কিনতে পারত, কিন্তু শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এভাবে নেওয়াটা মেনে নেওয়ার মতো নয় বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, শুরুর দিকে বিষয়টি বিজিবিকে জানানো হলেও তখন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশে এ ধরনের সীমান্ত-বাণিজ্যকে চোরাচালান হিসেবে গণ্য করে শুল্ক আইন ১৯৬৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ধারা ২৫(খ)-এ শাস্তির বিধান রাখা আছে।
নজরদারিতে ঘাটতি, কর্তৃপক্ষ কী বলছে
জলপথে রাতের বেলা এই পরিবহন চললেও প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। নৌ পুলিশের টহল না থাকার সুযোগে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও তারা জানান।
কুড়িগ্রাম পাট অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য পরিদর্শক এটিএম খায়রুল হক সমকালকে জানান, কয়েকজনের নাম পেলেও তারা জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করছেন না।
সন্দেহভাজন কয়েকজনের নাম পাওয়া গেলেও তারা জড়িত থাকার কথা স্বীকার করছেন না, আর পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় একার পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে — এটিএম খায়রুল হক, ভারপ্রাপ্ত মুখ্য পরিদর্শক, পাট অধিদপ্তর, কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন, লোকমুখে বিষয়টি শোনার পর গত সাত দিনে টহল বাড়ানো হয়েছে, তবে সরাসরি ঘটনার দৃশ্য এখনো তাদের চোখে পড়েনি।
শোনার পর থেকে টহল বাড়ানো হয়েছে, তবে হাতেনাতে কাউকে পাওয়া যায়নি এখনো; সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে — মো. মতিউর রহমান, সহকারী পরিচালক, ২২ বিজিবি ব্যাটালিয়ন, কুড়িগ্রাম
প্রশাসনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বিজিবির বাড়তি টহল ও পাট অধিদপ্তরের কয়েকজনের পরিচয় শনাক্তের তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। তবে জনবল সংকট ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে এখন পর্যন্ত কাউকে হাতেনাতে ধরা যায়নি বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেই স্পষ্ট।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান ও নজরদারি এখনো চলমান, নতুন কোনো অগ্রগতি এলে তা যুক্ত করা হবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!






