বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অসুস্থতাজনিত কারণে অনুপস্থিত থাকলেও এখন থেকে জরিমানা দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। গত ৩ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য সচিব ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। আদেশ প্রকাশের পরপরই ক্যাম্পাসে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এক নজরে নতুন নিয়ম
- স্নাতক (সম্মান): জরিমানা ১২০০ টাকা
- স্নাতকোত্তর: জরিমানা ১৫০০ টাকা
- আদেশ জারি: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. মো. ফেরদৌস রহমানের স্বাক্ষরে
- শর্ত: নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে ফি জমা না দিলে পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ নেই
অসুস্থতা প্রমাণেও রেহাই নেই, কেন এই সিদ্ধান্ত
নির্ধারিত এই ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অসুস্থতার প্রমাণ থাকলেও জরিমানা ছাড়া দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় বসার কোনো বিকল্প রাখা হয়নি।
আরো খবর:
- রংপুর বিভাগে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনে ৮ জেলায় সোয়া কোটি টাকা জরিমানা
- রংপুরে সাংবাদিক উৎস হত্যা মামলার রায়: একজনের ফাঁসি, দুজনের যাবজ্জীবন
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন: দোষ কার, শাস্তি কার
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও মিড উইক-সংক্রান্ত নিয়ম থাকলেও তা সব বিভাগে সমানভাবে মানা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরাই নিজের সুবিধামতো পরীক্ষার তারিখ ঠিক করেন, ফলে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আগেভাগে সময়সূচি জানতে পারেন না।
তাদের মতে, পরীক্ষার তারিখ আগে থেকে না জানিয়ে হঠাৎ জরিমানার নিয়ম কার্যকর করাটা শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায্য চাপ তৈরি করছে।
ছাত্রশিবিরের সভাপতি এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থী-বিরোধী বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, আর্থিক চাপ না বাড়িয়ে বরং যৌক্তিক ও স্বচ্ছ একটি নীতিমালা তৈরি হওয়া উচিত। তা না হলে শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বেরোবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন ইসলাম বলেন, বহু বিভাগে মিড উইক পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয় না। শিক্ষকরা যখন খুশি তখন পরীক্ষা নিলে, আর তাতে অনুপস্থিত থাকলেই জরিমানা করাটা তার কাছে একধরনের হয়রানি মনে হচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যান। জরিমানার বদলে মিড উইক অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চান তিনি, যাতে শিক্ষার্থীরা হয়রানির মুখে না পড়েন।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান সিয়াম জানান, এই টাকার অঙ্কটা কারও কাছে এক মাসের সিট ভাড়া, আবার কারও কাছে ১৫ দিনের খাবারের খরচের সমান। প্রশাসন এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোশারফ হোসেনের মতে, এই নিয়ম তখনই কার্যকর হওয়া উচিত যখন সেমিস্টারের শুরুতেই একজন শিক্ষার্থী জানতে পারবেন তার পরীক্ষা কবে হবে। প্রতিটি বিভাগের একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার থাকা দরকার, যেখানে ক্লাস ও পরীক্ষার সময়সূচি আগে থেকেই স্পষ্ট থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রশাসনের যুক্তি বনাম শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিন্ডিকেট সদস্য সচিব ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, জরিমানা আরোপ করাটাই মূল লক্ষ্য নয়। তার ভাষ্যে, সঙ্গত কারণ ছাড়া বা ভিত্তিহীন অজুহাতে মিড সেমিস্টার পরীক্ষা মিস করার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় যে হারে শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত থাকেন, ফাইনাল পরীক্ষায় সে তুলনায় অনুপস্থিতির হার অনেক কম। নতুন এই নিয়মের মাধ্যমে পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
এরপর কী হতে পারে
আদেশ জারির পর থেকে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ ও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন এখনো সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি, তবে ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবির মুখে বিষয়টি নিয়ে নতুন কোনো ঘোষণা এলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হবে।
জাগোনিউজ২৪.কম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।





