আমার জন্ম নিবন্ধনে বাবার নামের বানান ভুল ছিল, আর সেটা আমি জানতে পারি চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর
তিন বছর আগের কথা। আমি তখন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য কাগজপত্র জমা দিচ্ছিলাম। এনআইডি, সার্টিফিকেট, সব ঠিকঠাক — কিন্তু জন্ম নিবন্ধনে আমার বাবার নামের একটা অক্ষর ভুল ছিল, যা আমি কখনো খেয়ালই করিনি। এইচআর অফিস থেকে ফোন এলো, বলল কাগজ মিলছে না, সংশোধন করে না আনলে নিয়োগ আটকে যাবে। আমি সেদিনই বুঝেছিলাম, ছোট্ট একটা বানান ভুল কতটা বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে হলে প্রথমে bdris.gov.bd/br/correction ওয়েবসাইটে গিয়ে ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে রেকর্ড খুঁজে বের করতে হয়, ভুল তথ্য সিলেক্ট করে সঠিক তথ্য বসাতে হয়, প্রমাণক কাগজ আপলোড করতে হয়, এরপর প্রিন্ট করা আবেদন ফি সহ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন অফিসে জমা দিতে হয়। সাধারণ সংশোধন অনুমোদন হতে সময় লাগে কয়েকদিন থেকে দুই সপ্তাহের মতো।
এই ভুল সংশোধন না করালে জীবনের প্রতিটা ধাপে সমস্যা তাড়া করে বেড়ায়। কয়েকটা বাস্তব উদাহরণ দেখুন:
- এনআইডি আবেদনে আটকে যাওয়া — জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের সাথে না মিললে নতুন এনআইডি আবেদনই গ্রহণ হয় না।
- পাসপোর্ট রিজেক্ট হওয়া — নাম বা জন্মতারিখে গরমিল থাকলে পাসপোর্ট অফিস থেকে ফেরত পাঠানো হয়।
- স্কুল-কলেজ ভর্তিতে দেরি — ভর্তির শেষ মুহূর্তে সংশোধনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, অনেক সময় ভর্তির সময়সীমা পার হয়ে যায়।
- বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়া থমকে যাওয়া — ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিটের কাগজপত্র যাচাইয়ে আটকে যায়।
- মানসিক ক্লান্তি — একই অফিসে বারবার যাওয়া, একই কাগজ বারবার জমা দেওয়া মানুষকে ক্লান্ত করে ফেলে, অনেকে তো এই ঝামেলা এড়াতে ভুল তথ্য নিয়েই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন।
এই লেখায় আমি একদম শুরু থেকে দেখাব কীভাবে ধাপে ধাপে সংশোধনের আবেদন করবেন, কোন সংশোধনে কী কাগজ লাগে, ফি কত, আর কতবার এই সংশোধনের সুযোগ পাবেন।
অনলাইনে সংশোধনের আবেদন করবেন কীভাবে?

সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটা এখন অনলাইনভিত্তিক, তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য স্থানীয় অফিসে যেতে হয়ই। ধাপগুলো এভাবে সাজানো যায়:
- সরকারি সংশোধন পোর্টালে প্রবেশ করুন। এখানে ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে সার্চ করলে আপনার রেকর্ড স্ক্রিনে চলে আসবে।
- পুরনো ১৬ ডিজিটের সনদ থাকলে আগে ডিজিটাল করে নিন। ১৬ ডিজিটের সনদ দিয়ে সরাসরি সংশোধনের আবেদন করা যায় না — পুরনো হাতে লেখা সনদ ডিজিটাল করার নিয়ম দেখে সেটা আগে সেরে নিন।
- যে তথ্যটি ভুল, সেটা সিলেক্ট করুন — নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মস্থান, ঠিকানা বা জাতীয়তা যেটাই হোক, সংশ্লিষ্ট বক্সে টিক দিয়ে সঠিক তথ্য সাবধানে টাইপ করুন।
- প্রমাণক কাগজ স্ক্যান করে আপলোড করুন। ছবি যেন স্পষ্ট হয়, ঝাপসা বা কাটা ছবি হলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- মোবাইল নম্বরে আসা ওটিপি দিয়ে যাচাই করে আবেদন সাবমিট করুন।
- আবেদনের কপি প্রিন্ট করে ১৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় অফিসে জমা দিন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি সহ প্রিন্ট কপি জমা না দিলে সিস্টেম নিজে থেকেই আবেদনটি বাতিল করে দেয়, ফলে পুরো প্রক্রিয়া আবার নতুন করে শুরু করতে হয়।
bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে ফি পরিশোধ হয় না, ফি জমা দিতে হয় স্থানীয় অফিসে গিয়ে সরাসরি। আমি নিজে প্রথমবার এই ধাপটা মিস করে দুইবার অফিসে যাতায়াত করেছিলাম, তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগেই ফি এবং কাগজপত্র একসাথে গুছিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
নতুন করে জন্ম নিবন্ধনই এখনো করা না থাকলে সংশোধনের প্রশ্ন আসে না — সেক্ষেত্রে আগে নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদনের নিয়ম অনুসরণ করে প্রথমে নিবন্ধন করে নিতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের সরকারি ফি কত?
সংশোধনের ধরনভেদে সরকারি ফি আলাদা। নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা বা অন্য যেকোনো সাধারণ তথ্য সংশোধনে ফি ৫০ টাকা। শুধু জন্মতারিখ সংশোধনের জন্য ফি একটু বেশি, ১০০ টাকা। প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাস থেকে সংশোধনের ফি ধরা হয় ১ মার্কিন ডলার-এর সমপরিমাণ। এই ফি স্থানীয় অফিসে জমা দেওয়ার সময় দিতে হয়, অনলাইনে নয়।
জন্মতারিখ বা বয়স সংশোধন করা যায় কতটা সহজে?
আগে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জন্ম সাল বদলানো তুলনামূলক সহজ ছিল, কিন্তু বয়স নিয়ে অপব্যবহার ঠেকাতে নিয়ম কঠোর করা হয়েছে। বর্তমানে শুধুমাত্র জন্মতারিখের দিন ও মাস উপযুক্ত প্রমাণসহ সংশোধনযোগ্য, জন্মসাল বা বয়স পরিবর্তন কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারো জন্মসাল সংশোধন প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিশেষ অনুমোদন লাগে, যা সাধারণ আবেদনের চেয়ে অনেক জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
একবার প্রতিবেশীর জন্মসাল সংশোধনের কাগজ গুছিয়ে দিতে সাহায্য করেছিলাম — শুধু স্কুল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে কাজ হবে ভেবেছিলাম, কিন্তু পরে জানা গেল প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির রেজিস্টার এবং জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবেদনই গ্রহণ হচ্ছিল না। এই বাস্তবতাটা আগে থেকে জানা থাকলে অনেক সময় ও দৌড়াদৌড়ি বাঁচানো যায়।
দেখে নিন ভিডিওতে পুরো প্রক্রিয়াটা ধাপে ধাপে কীভাবে করবেন:
পিতা-মাতার নাম বা ঠিকানা সংশোধনে কী কাগজ লাগবে?
সংশোধনের ধরন অনুযায়ী কাগজের তালিকা আলাদা হয়। নিচের টেবিলে সবচেয়ে সাধারণ চারটি সংশোধনের ধরন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এক নজরে দেখানো হলো —
| সংশোধনের ধরন | প্রয়োজনীয় প্রধান কাগজপত্র | সরকারি ফি | আনুমানিক সময় |
|---|---|---|---|
| নিজের নাম | শিক্ষা সনদ, এনআইডি (থাকলে), অভিভাবকের এনআইডি | ৫০ টাকা | ৭–১৫ দিন |
| পিতা-মাতার নাম | পিতা-মাতার এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন সনদ | ৫০ টাকা | ১০–২০ দিন |
| স্থায়ী বা জন্মস্থানের ঠিকানা | হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ বা ইউটিলিটি বিল, স্থানীয় প্রত্যয়নপত্র | ৫০ টাকা | ৭–১৫ দিন |
| জন্মতারিখ (শুধু দিন-মাস) | হাসপাতালের ছাড়পত্র, স্কুলের প্রথম ভর্তি রেজিস্ট্রেশনের প্রমাণ | ১০০ টাকা | ১৫–৩০ দিন বা বেশি |
আঠারো বছরের কম বয়সী কারও সংশোধনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলকভাবে লাগবে, কারণ শিশু নিজে আবেদনকারী হতে পারে না। আঠারো পেরিয়ে যাওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নিজের এসএসসি সনদ বা নিজের এনআইডিই প্রমাণক হিসেবে যথেষ্ট, তবে দুই ক্ষেত্রেই পিতা-মাতার তথ্য সংশোধন করতে চাইলে তাদের নিজস্ব পরিচয়পত্রও লাগবে।
কাগজপত্র জমা দেওয়ার আগে নিজের প্রস্তুতি ঠিক আছে কিনা যাচাই করতে এই ছোট্ট চেকলিস্টটা দেখে নিন:
- [সংশোধনযোগ্য তথ্যের সাথে মিল রেখে সঠিক প্রমাণক কাগজ বাছাই করা হয়েছে
- সব কাগজের স্ক্যান বা ছবি স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ
- আবেদনকারীর সচল মোবাইল নম্বর হাতের কাছে আছে (ওটিপির জন্য)
- নির্ধারিত ফি সাথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
- আবেদনের প্রিন্ট কপিতে সব তথ্য সঠিকভাবে বসেছে কিনা আরেকবার মিলিয়ে দেখা হয়েছে
ওয়েবসাইটে ওটিপি না এলে বা সার্ভার এরর দেখালে কী করবেন?
bdris.gov.bd-তে হঠাৎ সার্ভার স্লো হয়ে যাওয়া বা ওটিপি দেরিতে আসা নতুন কিছু নয়, বিশেষ করে অফিস চলাকালীন ব্যস্ত সময়ে অনেকেই এই সমস্যায় পড়েন। কয়েকটা কাজ করলে সমস্যা অনেকটাই কমে —
- একাধিকবার বাটনে ক্লিক না করে অন্তত এক-দুই মিনিট অপেক্ষা করুন, বারবার রিফ্রেশ করলে সার্ভারে চাপ আরও বাড়ে।
- ব্রাউজারের ক্যাশ পরিষ্কার করে বা অন্য একটি ব্রাউজার (যেমন Chrome-এর বদলে Firefox) দিয়ে চেষ্টা করুন।
- অফিস আওয়ারের বাইরে, যেমন রাতের দিকে বা খুব সকালে, অনেকেরই অভিজ্ঞতায় ওয়েবসাইটটা তুলনামূলক দ্রুত কাজ করে — যদিও এটা সরকারিভাবে নিশ্চিত কোনো নিয়ম নয়, শুধু ব্যবহারকারীদের সাধারণ পর্যবেক্ষণ।
- মোবাইল নম্বরে বারবার ওটিপি না এলে নম্বরটা সচল আছে কিনা এবং ব্যালেন্স বা নেটওয়ার্ক সমস্যা নেই তো, সেটাও একবার যাচাই করে নিন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রতিদিন অফিসে ফোন না করে ঘরে বসেই আবেদনের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা যায়। bdris.gov.bd/br/application/status পেজে গিয়ে আবেদনপত্রের ধরন থেকে “জন্ম তথ্য সংশোধন এর আবেদন” বেছে নিন, তারপর অ্যাপ্লিকেশন আইডি ও জন্মতারিখ দিয়ে “দেখুন” বাটনে ক্লিক করলেই আবেদনটা এখন অপেক্ষমান, অনুমোদিত নাকি বাতিল অবস্থায় আছে তা দেখা যাবে। বিস্তারিত ধাপ জানতে আবেদনের বর্তমান অবস্থা যাচাই লেখাটাও দেখে নিতে পারেন।
সংশোধিত সনদ হাতে পাওয়ার পর সেটা মোবাইল দিয়ে ডাউনলোড করার নিয়ম জেনে রাখলে পরবর্তীতে দরকার পড়লে সহজেই বের করতে পারবেন।
জন্ম নিবন্ধন মোট কতবার সংশোধন করা যায়?
একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ সর্বোচ্চ চারবার সংশোধন করা যায়। এরপর আরও সংশোধনের প্রয়োজন হলে স্বাভাবিক অনলাইন প্রক্রিয়ার বাইরে বাড়তি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাই একবারে যতগুলো ভুল আছে সব একসাথে সংশোধনের আবেদনে দিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ — নাম ঠিক করতে একবার, ঠিকানার জন্য আরেকবার আলাদা আলাদা আবেদন করলে সুযোগ দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
জন্ম নিবন্ধনের আইনি কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিবন্ধক জেনারেলের কার্যালয়ের অফিসিয়াল পেজ দেখতে পারেন, যেখানে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ও বিধিমালা প্রকাশিত আছে। জন্মতারিখ সংশোধনের নিয়ম সম্প্রতি কেন কঠোর হয়েছে, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়ে নিতে পারেন। আর জন্ম নিবন্ধন কেন একটি শিশুর জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদনে বিস্তারিত পাওয়া যায়।
জন্ম নিবন্ধনের কোনো তথ্য এখনো ডিজিটাল সিস্টেমে সঠিকভাবে আছে কিনা নিশ্চিত হতে চাইলে সংশোধনের আবেদন করার আগে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাই করার উপায় থেকে একবার মিলিয়ে নেওয়া ভালো অভ্যাস। আর পিতা-মাতার নিজস্ব জন্ম নিবন্ধন সনদ না থাকলে সন্তানের সংশোধনের আবেদন আটকে যেতে পারে — সেক্ষেত্রে পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলে করণীয় নিয়ম আগে দেখে নিন।
যারা আগে থেকেই এই কাজটা করে রাখেন, তারা কীভাবে ঝামেলা এড়ান
অভিজ্ঞরা আবেদন করার আগে একটা কাজ সবসময় করেন — এনআইডি, পাসপোর্ট, এসএসসি/এইচএসসি সনদ আর জন্ম নিবন্ধন, এই চারটা কাগজ পাশাপাশি রেখে নাম, বাবা-মায়ের নাম ও জন্মতারিখ অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে নেন। একবারে যা যা অমিল পাওয়া যায়, সবকটা একটাই আবেদনে জমা দিয়ে দেন, যাতে চারবারের সীমিত সুযোগ অপচয় না হয়।
সাধারণ বানান বা ঠিকানা সংশোধনের বড় অংশ আবেদন প্রথম দফাতেই অনুমোদন পায়, যদি কাগজপত্র সম্পূর্ণ ও স্পষ্ট থাকে। যেসব আবেদন প্রথমবারে আটকে যায়, তার বড় কারণ হলো অস্পষ্ট স্ক্যান কপি বা তথ্যের অসামঞ্জস্য — টাকা বা সময়ের সমস্যা নয়, শুধু প্রস্তুতির ঘাটতি।
একসাথে সব ভাইবোনের রেকর্ড মেলানো কেন জরুরি
পরিবারে একাধিক সন্তান থাকলে বাবা-মায়ের নামের বানান প্রতিটি সন্তানের সনদে একই রকম হওয়া দরকার। একজনের সনদে “মোঃ” আর আরেকজনেরটায় পুরো “মোহাম্মদ” লেখা থাকলে ভবিষ্যতে ওয়ারিশ সনদ বা সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজে যাচাই কর্মকর্তা সন্দেহ করেন। তাই একজনের সংশোধন করাতে গেলে বাকি ভাইবোনের রেকর্ডও একই সাথে মিলিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
দীর্ঘমেয়াদে সংশোধিত তথ্য অক্ষত রাখার নিয়ম
সংশোধিত সনদ পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো সেটার একটা প্রিন্ট কপি ও ডিজিটাল কপি দুটোই আলাদা ফোল্ডারে রেখে দেওয়া। এনআইডি সংশোধন, পাসপোর্ট নবায়ন বা চাকরির কাগজপত্রে পরবর্তীতে এই নতুন কপিটাই ব্যবহার করবেন, পুরনো ভুল কপি নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, স্কুল রেকর্ড বা জমির দলিলের মতো জায়গায় পুরনো তথ্য থেকে গেলে সংশোধনের সুফল অর্ধেক পাওয়া যায়।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি — সংশোধনের পর আমি নিজে ব্যাংকের রেকর্ড আপডেট করাতে ভুলে গিয়েছিলাম, ফলে পরে ঋণের আবেদনে আবার নতুন করে কাগজ জমা দিতে হয়েছিল। তাই সংশোধিত সনদ হাতে পেলে যেসব জায়গায় জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করেছেন, সবগুলোর তালিকা করে একে একে আপডেট করিয়ে ফেলাই ভালো।
যেসব ভুলের কারণে মানুষ বারবার একই কাজে আটকে যায়

সংশোধনের আবেদন নিয়ে মানুষ যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি করে, তার একটা বড় অংশ আসে তাড়াহুড়ো থেকে।
একবারে একটা তথ্যই ঠিক করা। নামের বানান ঠিক করতে গিয়ে ঠিকানার ভুলটা চোখ এড়িয়ে যায়। পরে আবার নতুন আবেদন করতে হয়, আর এতে চারবারের সুযোগের একটা এমনি এমনি খরচ হয়ে যায়। এটা এড়াতে আবেদনের আগে পুরো সনদটা একবার মনোযোগ দিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলুন।
ঝাপসা বা কাটা ছবি আপলোড করা। মোবাইলে তাড়াহুড়ো করে তোলা ছবিতে এনআইডির নম্বর অস্পষ্ট থাকলে আবেদন পেন্ডিং অবস্থায় আটকে থাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। স্ক্যানার না থাকলেও ভালো আলোয়, সোজা করে, পুরো কাগজটা ফ্রেমে রেখে ছবি তোলা প্রয়োজন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রিন্ট কপি জমা না দেওয়া। এটা সবচেয়ে বড় ভুল। অনলাইন আবেদন শুধু প্রথম ধাপ, নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে গেলে সিস্টেম নিজে থেকেই আবেদন বাতিল করে দেয় এবং পুরো প্রক্রিয়া আবার নতুন করে শুরু করতে হয়।
জন্মসাল বদলাতে চাওয়া সাধারণ সংশোধনের মতো সহজ ভেবে। এখন এটা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিশেষ অনুমোদনের বিষয়। সাধারণ প্রক্রিয়ায় আবেদন করে বসে থাকলে মাসের পর মাস কোনো অগ্রগতি ছাড়াই কেটে যায়, আর সেই সময়টায় পাসপোর্ট বা ভর্তির মতো জরুরি কাজ আটকে থাকে।
মোবাইল নম্বর বদলে ফেলার পর পুরনো নম্বরই ব্যবহার করা। ওটিপি না পেলে আবেদনই সাবমিট হয় না, অনেকে এখানে এসে আটকে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ রেখে দেন।
এই ভুলগুলো এড়িয়ে চললে সংশোধন ১০০% নির্বিঘ্ন হয়ে যায় না, তবে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায় এবং বারবার একই অফিসে ছোটার ধকল অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হয়।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন নিয়ে মানুষ যেসব প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি করে
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কত টাকা লাগে?
সাধারণ তথ্য (নাম, ঠিকানা, পিতা-মাতার নাম) সংশোধনে সরকারি ফি ৫০ টাকা, আর জন্মতারিখ সংশোধনে ১০০ টাকা। প্রবাসীদের জন্য দূতাবাসে ফি ধরা হয় প্রায় ১ মার্কিন ডলার।
শুধু অনলাইনে আবেদন করলেই কি সংশোধন হয়ে যায়?
না, অনলাইন আবেদন শুধু প্রথম ধাপ। প্রিন্ট কপি ও প্রমাণক কাগজ ১৫ দিনের মধ্যে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন অফিসে জমা দিলে তবেই নিবন্ধক তা যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করতে কত দিন লাগে?
সাধারণ বানান বা ঠিকানা সংশোধনে সময় লাগে মোটামুটি এক থেকে দুই সপ্তাহ। পিতা-মাতার তথ্য বা বড় কোনো পরিবর্তনে সময় আরেকটু বেশি লাগতে পারে, বিশেষ করে অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে।
জন্ম নিবন্ধনে জন্মসাল সংশোধন করা যায় কি?
এখন এটা খুব সীমিত পরিসরে সম্ভব। সাধারণ অনলাইন প্রক্রিয়ায় শুধু দিন ও মাস সংশোধনযোগ্য, জন্মসাল বদলাতে হলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আলাদা ও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
একবার আবেদন পেন্ডিং বা বাতিল হলে কি আবার আবেদন করা যায়?
হ্যাঁ, ত্রুটি সংশোধন করে আবার আবেদন করা যায়, তবে প্রতিটি চেষ্টা মোট চারবারের সীমার মধ্যেই গণনা হয়। তাই প্রথমবারেই কাগজপত্র সম্পূর্ণ রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ।
একই ব্যক্তির নামে একাধিক জন্ম নিবন্ধন থাকলে কী করব?
একাধিক জন্ম নিবন্ধন থাকা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর জন্য জরিমানার বিধান আছে। এক্ষেত্রে সংশোধনের বদলে একটি সনদ বাতিলের আবেদন করতে হয়, যা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনের নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী নিবন্ধক যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন।
আজ থেকেই যা করতে পারেন
জন্ম নিবন্ধনের একটা ছোট ভুল হয়তো আজ তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না, কিন্তু এনআইডি, পাসপোর্ট বা চাকরির কাগজে গিয়ে সেটাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভালো খবর হলো, পুরো প্রক্রিয়াটা এখন ঘরে বসেই শুরু করা যায়, আর কাগজপত্র গোছানো থাকলে সংশোধনও সময়মতো হয়ে যায়।
নিজের ও পরিবারের সবার জন্ম নিবন্ধন সনদ আজই একবার বের করে এনআইডি বা পাসপোর্টের সাথে মিলিয়ে দেখুন। কোথাও অমিল পেলে দেরি না করে আবেদনটা করে ফেলুন — আমি নিজে এই ছোট্ট অভ্যাসটা রপ্ত করার পর থেকে পরিবারের কারো কাগজপত্র নিয়ে আর শেষ মুহূর্তের দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়নি।
যেহেতু সরকারি নিয়মে মাঝেমধ্যে পরিবর্তন আসে আর অফিসভেদে ছোটখাটো চর্চাও একটু আলাদা হতে পারে, তাই আবেদনের আগে নিজের এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি করপোরেশনের নিবন্ধক অফিসের সবশেষ নোটিশ বা নির্দেশনাটাও একবার দেখে বা জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!










