বাংলাদেশের সিগারেট: সংখ্যায় নয়, ভাগ ধরে বোঝা যায়
বাংলাদেশে কত প্রকার সিগারেট আছে, তার কোনো সরকারি গোনাগুনতি নেই। বাজারে নতুন প্যাকেট আসে, পুরনোটা সরে যায়, আর সংখ্যাটা বছরে বছরে বদলায়। তবু একটা জায়গায় সিগারেটকে নির্দিষ্ট কয়েকটা ভাগে ফেলা হয়, আর সেটা দেশের কর-কাঠামো।
স্বাস্থ্য-অর্থনীতিবিদদের হিসাবে দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৫ শতাংশ সিগারেট টানেন। তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর এক বিবৃতি অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৫ শতাংশেরও বেশি কোনো না কোনো তামাকপণ্য ব্যবহার করেন। এত বড় বাজারে ভাগগুলো জানা থাকলে দাম, আইন আর ক্ষতির আলোচনা সহজে বোঝা যায়।
সংক্ষেপে উত্তর: বাংলাদেশে সিগারেটের নির্দিষ্ট কোনো সরকারি সংখ্যা নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর-কাঠামোয় সিগারেট চারটি দামের স্তরে (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) ভাগ করা, আর ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন সিগারেটের জন্য আলাদা হিসাব আছে। এর বাইরে স্বাদ ও আকারের ভাগ বাজারে প্রচলিত। সিগারেটের বাইরে বিড়ি ও ধোঁয়াহীন তামাক আলাদা তামাকপণ্য হিসেবে গণ্য হয়।
সিগারেটের ধরন কয়টি, এই প্রশ্নের আসল কাজ বাজারের হিসাব বোঝা। একই দোকানে পাশাপাশি রাখা দুটো প্যাকেটের দামে বড় ফারাক থাকে, আর সেই ফারাকের পেছনে থাকে করের হার আর স্তরের হিসাব। দামের বর্তমান অবস্থা জানতে আমাদের সিগারেটের নতুন দাম নিয়ে লেখাটি দেখতে পারেন।
এই লেখায় ব্র্যান্ডের নাম নেই, শুধু ধরন আর ভাগ নিয়ে আলোচনা আছে। সাথে পাবেন বাজারের হিস্যা, কর-কাঠামোর সমালোচনা, ভুল ধারণার জবাব আর সাধারণ প্রশ্নের উত্তর।
সিগারেট কত ভাগে ভাগ করা যায়?
সিগারেটকে ভাগ করার ছয়টা অক্ষ আছে, যার কিছু সরকারি কর-কাঠামো থেকে আসে, কিছু বাজারের প্রচলন থেকে। নিচের টেবিলে একসাথে দেখুন:
| ভাগের ভিত্তি | কী কী ভাগ | ভাগের উৎস |
|---|---|---|
| দামের স্তর | নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ, প্রিমিয়াম | কর-কাঠামো |
| গড়ন | ফিল্টারযুক্ত, ফিল্টারবিহীন | কর-কাঠামো |
| প্যাকেট | ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা দাম করের ভিত্তি | কর-কাঠামো |
| আকার | রেগুলার, কিং সাইজ, স্লিম | বাজারে প্রচলিত শ্রেণি |
| স্বাদ | প্লেন তামাক, মেন্থল, ক্যাপসুল, লবঙ্গ | বৈশ্বিকভাবে প্রচলিত শ্রেণি |
| পণ্যের ধরন | সিগারেট, বিড়ি, ধোঁয়াহীন তামাক | কর-কাঠামো |
দামের স্তর: চারটি ধাপ
সিগারেটের দামের স্তর চারটি: নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। স্বাস্থ্য-অর্থনীতিবিদদের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি স্তরে ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা দাম একটি নির্দিষ্ট সীমার ওপরে গেলেই সেটি ওই স্তরে পড়ে।
করের হিসাবটা তিন ভাগে হয়:
- সম্পূরক শুল্ক: খুচরা দামের একটি শতাংশ, আর স্তরভেদে এই হার আলাদা।
- মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট): ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী সব স্তরে ১৫ শতাংশ।
- স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ: সব স্তরে ১ শতাংশ।
হারগুলো বাজেটে বদলাতে পারে, তাই হালনাগাদ অঙ্ক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে দেখে নেওয়া ভালো।
চার স্তরের বাজারে কার দখল কতটা?
স্তর চারটি হলেও বিক্রি সব স্তরে সমান নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নিম্ন স্তরের সিগারেটের হিস্যা ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। এরপর তা বেড়ে আগের দশকের বড় সময় ৭০ শতাংশের ওপরে থেকেছে, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে প্রায় ৬০ শতাংশে।
উল্টো দিকে উচ্চ স্তরের হিস্যা ২০০৬-০৭ সালের প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ এ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৮৫ শতাংশে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে বলেন “ডাউনট্রেডিং”, অর্থাৎ দাম বাড়লে ক্রেতারা ছেড়ে না দিয়ে সস্তা স্তরে সরে যান।
এই চার স্তরের বাইরেও একটা ভাগ আছে। একই প্রতিবেদনে এনবিআর ও শিল্প-সংশ্লিষ্টদের অনুমানের কথা বলা হয়েছে, যে কর-ব্যবস্থার বাইরের অবৈধ সিগারেট বাজারের চাহিদার প্রায় ১২ থেকে ১৮ শতাংশ মেটায়।
ফিল্টারযুক্ত আর ফিল্টারবিহীন
ফিল্টারযুক্ত সিগারেটের এক প্রান্তে ফিল্টার লাগানো থাকে, ফিল্টারবিহীনটা কেবল কাগজে মোড়ানো তামাক। কর-কাঠামোয় এই দুই ধরনের জন্য আলাদা হিসাব আছে।
ফিল্টার থাকলেই সিগারেট নিরাপদ হয় না। ফিল্টার আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা জানতে দেখতে পারেন সিগারেটের ফিল্টার নিয়ে আমাদের আগের লেখাটি।
ফিল্টারের রং নিয়েও একটা প্রচলিত ধারণা আছে। কেউ কেউ বাদামি ফিল্টারকে কড়া আর সাদা ফিল্টারকে হালকা মনে করেন। এমন কোনো সরকারি বা চিকিৎসাভিত্তিক শ্রেণিবিভাগের সূত্র পাওয়া যায় না, রং মূলত প্রস্তুতকারকের নকশার সিদ্ধান্ত। “লাইট” বা “মাইল্ড”-এর মতো শব্দ ক্রেতাকে কম ক্ষতির ভুল ধারণা দেয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ কনভেনশনের নির্দেশনায় এসব শব্দ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আকার আর প্যাকেট
বাজারে সাধারণত রেগুলার, কিং সাইজ ও স্লিম আকারের সিগারেট পাওয়া যায়। এই ভাগ সরকারি কর-কাঠামোর অংশ নয়, বাজারের প্রচলিত শ্রেণিবিভাগ।
করের ভিত্তি ধরা হয় ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা দাম। আইনেও প্যাকেটের আকার, আয়তন আর ভেতরের সংখ্যা নিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী “স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং”-এর সংজ্ঞা আছে। প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকাও আইনের বিধান।
স্বাদের ভিত্তিতে সিগারেটের ধরন
তামাকের স্বাদ ধরে সিগারেটকে মোটামুটি চার ভাগে ফেলা যায়:
- প্লেন তামাক: সাধারণ তামাকের নিজস্ব স্বাদ।
- মেন্থল: পুদিনার মতো ঠান্ডা অনুভূতি দেয়।
- ক্যাপসুল বা সুইচ: ফিল্টারের ভেতরে ছোট একটি বল থাকে, চাপ দিলে সেটি ভেঙে মেন্থল বা ফলের স্বাদ ছড়ায়।
- লবঙ্গের সিগারেট (ক্লোভ বা ক্রেটেক): তামাকের সাথে লবঙ্গ মেশানো।
তামাকশিল্পের নজরদারি সংস্থা টোব্যাকো ট্যাকটিক্সের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সিগারেট বাজারের প্রায় ১০ শতাংশ মেন্থল, আর ক্যাপসুল সিগারেট তরুণদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। স্বাদ কড়া ধোঁয়ার ঝাঁঝ কমায় বলে নতুন ধূমপায়ীর জন্য শুরু করা সহজ হয়ে যায়, এটাই জনস্বাস্থ্যবিদদের উদ্বেগ। বাংলাদেশের বাজারে কোন স্বাদ কতটা চালু, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
সিগারেটের বাইরের তামাকপণ্য
কর-কাঠামোয় তামাকপণ্য তিন ধরনে ভাগ করা: সিগারেট, বিড়ি ও ধোঁয়াহীন তামাক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় এর সাথে আছে চুরুট, সিগারিলো, হুঁকো বা ওয়াটারপাইপ তামাক, হাতে গোটানো তামাক, পাইপ তামাক আর হিটেড তামাক।
বিড়ি আর সিগারেটের পার্থক্য মূলত তিনটি জায়গায়:
- মোড়ক: বিড়িতে তামাক মোড়ানো থাকে শুকনো গাছের পাতায় (যেমন টেন্ডু), সিগারেটে থাকে বিশেষ কাগজ।
- ফিল্টার: বিড়িতে সাধারণত ফিল্টার থাকে না।
- উৎপাদন: বিড়ি প্রধানত হাতে গোটানো হয়, আর সিগারেট কারখানায় মেশিনে তৈরি হয়।
ই-সিগারেট, ভ্যাপ ও নিকোটিন পাউচের মতো উদীয়মান পণ্য নিয়ে আইনি অবস্থা সম্প্রতি বদলেছে। সংবাদ অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল পাস হয়েছে, যেখানে এসব পণ্য নিষিদ্ধের বিধান বাতিল করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছে। সর্বশেষ পাঠ সরকারি সূত্রে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

কম-জানা তথ্য: চারটি স্তরের কর-কাঠামো নিয়ে কেন প্রশ্ন ওঠে?
স্বাস্থ্য-অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জটিল বহুস্তরীয় কর-কাঠামোর ফলে সিগারেট সস্তা ও সহজলভ্য থেকে গেছে। একই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দাম বাড়লে অনেক ধূমপায়ী ছাড়ার বদলে সস্তা স্তরের সিগারেটে সরে যান।
তামাকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা মধ্যমেয়াদে স্তরের সংখ্যা চার থেকে কমিয়ে দুইয়ে আনার সুপারিশ করেছেন। অর্থাৎ ভাগের সংখ্যা যত কম হয়, সস্তা স্তরে সরে যাওয়ার সুযোগও তত কমে।
সিগারেটের ধরন নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল বিশ্বাস
“দামি বা প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেট কম ক্ষতিকর।” স্তর ঠিক হয় দাম আর করের হিসাবে, ক্ষতির মাত্রা দিয়ে নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে তামাকের সব রূপই ক্ষতিকর, আর কোনো মাত্রাই নিরাপদ নয়। আসক্তির প্রশ্নে আমাদের সিগারেট কি মাদক নিয়ে লেখাটি পড়তে পারেন।
“বিড়ি বা ধোঁয়াহীন তামাক সিগারেটের চেয়ে নিরাপদ।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিড়ি, হুঁকো, ধোঁয়াহীন তামাক সবকেই তামাকপণ্যের তালিকায় রেখে একই ক্ষতির কথা বলে। ধরন বদলালে ক্ষতির চরিত্র বদলায়, ক্ষতি থেকে যায়।
“সাদা ফিল্টার বা ‘লাইট’ সিগারেট হালকা, তাই কম ক্ষতিকর।” ফিল্টারের রং বা প্যাকেটের “লাইট” লেখা ক্ষতি কমানোর কোনো নিশ্চয়তা নয়। এই ধারণা ক্রেতাকে ভুল নিরাপত্তাবোধ দেয় বলেই আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় এমন শব্দ নিরুৎসাহিত করা হয়।
বাংলাদেশের সিগারেট নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বাংলাদেশে সিগারেটের দামের স্তর কয়টি?
দামের স্তর চারটি: নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা দামের ভিত্তিতে এই ভাগ করে।
কোন স্তরের সিগারেট সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়?
নিম্ন স্তর। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল এই স্তরের দখলে, আর আগের দশকের বড় অংশে এই হার ৭০ শতাংশের ওপরে ছিল।
ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন সিগারেটের পার্থক্য কী?
ফিল্টারযুক্ত সিগারেটের এক মাথায় ফিল্টার থাকে, ফিল্টারবিহীনে থাকে না। কর-কাঠামোয় দুই ধরনের জন্য আলাদা হিসাব ধরা হয়, তবে ক্ষতির দিক থেকে কোনোটিই নিরাপদ নয়।
ফিল্টারের রং কি ক্ষতির মাত্রা বদলায়?
না। সাদা বা বাদামি, ফিল্টারের রং প্রস্তুতকারকের নকশার সিদ্ধান্ত, এর সাথে ক্ষতির মাত্রার কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক নেই।
বিড়ি ও সিগারেট কি একই আইনে নিয়ন্ত্রিত হয়?
দুটোই তামাকজাত দ্রব্য হিসেবে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের আওতায় পড়ে। কর-কাঠামোয় অবশ্য সিগারেট, বিড়ি ও ধোঁয়াহীন তামাকের হিসাব আলাদা।
সিগারেটের প্যাকেটে কী থাকা বাধ্যতামূলক?
আইন অনুযায়ী তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষতি সম্পর্কিত সচিত্র সতর্কবাণী মুদ্রণ করতে হয়। প্যাকেটের আকার ও ভেতরের সংখ্যা নিয়েও সরকারি নির্দেশনা আছে।
শেষ কথা: ধরন বদলালেও বিপদ বদলায় না
বাংলাদেশে ফিল্টার, আকার, স্বাদ বা করের হিসাবে সিগারেটের বহু ধরন থাকলেও কোনোটিই নিরাপদ নয়। সংখ্যা গুনে বলা না গেলেও ভাগগুলো জানলে বাজারের ছবিটা পরিষ্কার হয়: চারটি দামের স্তর, নিম্ন স্তরের বড় দখল, ফিল্টারের ভাগ আর সিগারেটের বাইরের তামাকপণ্য। প্রিমিয়াম স্তরের দামি প্যাকেট হোক বা নিম্ন স্তরের সস্তা শলাকা, তামাকের ক্ষতি থেকে কেউ বাদ পড়ে না। তাই ধরন চেনার চেয়ে আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের ফিচার ক্যাটাগরিতে এমন আরও তথ্যবহুল লেখা পাবেন। কাজের মনে হলে লেখাটা পরিচিত কারও সাথে শেয়ার করুন।




