পাসপোর্ট অফিসের কাউন্টারে ফেরত আসা সেই ফাইল
ফাইলটা কাউন্টারের ওপাশ থেকে ফেরত এল। কারণ ছোট্ট একটা লাইন: “ইংরেজি জন্ম নিবন্ধন সনদ লাগবে।”
আমার ছোট ভাইয়ের পাসপোর্টের আবেদন সেদিন আটকে গিয়েছিল শুধু এই কারণে। বাংলা সনদে সবকিছু ঠিক ছিল। নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম, সব। তবু ইংরেজি ভার্সন ছাড়া কাজ এগোয়নি।
বাড়ি ফিরে সারা রাত গুগলে ঘেঁটেছি। কেউ বলে ইউনিয়ন পরিষদে যান, কেউ বলে অনলাইনে হয়, কেউ আবার বলে টাকা দিলে করে দেবে। কোনটা ঠিক, বুঝতেই পারছিলাম না।
পরের কয়েক দিনে আমি নিজে পুরো প্রক্রিয়াটা করেছি। ভুলও করেছি, ঘুরেওছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখা।
সংক্ষেপে উত্তর: জন্ম নিবন্ধন বাংলা থেকে ইংরেজি করতে প্রথমে everify পোর্টালে নিজের সনদ চেক করুন, ইংরেজি তথ্য আগে থেকেই থাকতে পারে। না থাকলে bdris পোর্টালে সংশোধনের আবেদন করে নাম, বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানা ইংরেজিতে দিন। কাগজপত্র আপলোড করে ফি দিন। এরপর আবেদনের প্রিন্ট কপি নিয়ে স্থানীয় নিবন্ধক কার্যালয়ে জমা দিন। অনুমোদন হলে ইংরেজি সনদ ডাউনলোড করা যাবে।
এই ঝামেলায় কোথায় কোথায় আটকে যেতে হয়
ইংরেজি সনদ লাগে অনেক জায়গায়। পাসপোর্ট, ভিসা, বিদেশে পড়াশোনা, কিছু চাকরির আবেদন। সময়মতো না পেলে সুযোগটাই হাতছাড়া হয়ে যায়।
আমার নিজের দেখা আর শোনা অভিজ্ঞতায় এই চারটা জায়গায় সবচেয়ে বেশি আটকায়:
- অফিসে গিয়ে শোনা যায়, আজ সচিব নেই
- অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে ফাইল আপলোড হয় না
- ইংরেজি নামের বানান এসএসসি সনদের সাথে মেলে না
- কত টাকা লাগে, কেউ স্পষ্ট করে বলে না, ফলে দালালের পকেটে বাড়তি টাকা যায়
এর সাথে আছে মানসিক চাপ। ভিসার তারিখ ঘনিয়ে আসছে আর আপনি অফিস থেকে অফিসে ঘুরছেন। রাতে ঘুম আসে না, বারবার মনে হয়, এই ছোট কাজটা এত কঠিন কেন?
বাবা-মায়ের নামের বানান নিয়ে ঝামেলা হলে পরিবারেও টেনশন তৈরি হয়। অথচ দোষ প্রায়ই কারও নয়। ছোটবেলায় সনদ করার সময় ইংরেজি তথ্য দেওয়ার চলই ছিল না।
তবে ভয়ের কিছু নেই। প্রক্রিয়াটা একবার বুঝে নিলে কঠিন না। ঠিক ক্রমে এগোলে সময়ও বাঁচে, টাকাও।
আবেদনের আগে একটা কাজ: আপনার সনদে ইংরেজি তথ্য আছে কিনা দেখুন

everify.bdris.gov.bd এ গিয়ে ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিন। পদ্ধতিটা ধাপে ধাপে দেখানো আছে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাইয়ের নিয়ম লেখায়।
অনেক সময় সিস্টেমে ইংরেজি তথ্য আগেই ঢোকানো থাকে। তখন নতুন করে আবেদন লাগে না।
ফলাফলে দুই রকম ছবি আসতে পারে:
- ইংরেজি নাম ও ঠিকানা দেখাচ্ছে: তথ্য আছে। এবার ঠিক আছে কিনা মিলিয়ে নিন
- ইংরেজি ঘর ফাঁকা বা ভুল: সংশোধনের আবেদন করতে হবে
আমার ভাইয়ের ক্ষেত্রে ইংরেজি নামের ঘর ফাঁকা ছিল। বাবার নামের ইংরেজি বানানও ভুল ছিল।
কোন কাগজ হাতের কাছে রাখবেন?
কী কী কাগজ লাগে, এটাই সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন। সাধারণত নিচের কাগজগুলো চাওয়া হয়। কার্যালয়ভেদে চাহিদা সামান্য আলাদা হতে পারে, তাই আবেদনের আগে নিজের নিবন্ধকের কাছ থেকে জেনে নিন।
- বর্তমান বাংলা জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি
- এসএসসি বা এইচএসসি সনদ (থাকলে), যেখানে ইংরেজি নাম আছে
- আবেদনকারীর বা বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র
- পাসপোর্টের কপি (আগে থেকে থাকলে)
- স্কুলের প্রশংসাপত্র বা পুরোনো কোনো ইংরেজি প্রমাণপত্র
আপনার সনদ যদি হাতে লেখা বা পুরোনো ধরনের হয়, আগে সেটা অনলাইন ডাটাবেজে আছে কিনা দেখে নিন। না থাকলে আগে হাতে লেখা জন্ম নিবন্ধন ডিজিটাল করার নিয়ম মেনে সেটা করতে হবে।
কাগজ স্ক্যান করার সময় যে ভুলটা করবেন না
স্ক্যান ঝাপসা হলে আবেদন ফেরত আসে। ছবি তোলার আগে তিনটা কাজ করুন:
- কাগজ সমান টেবিলে রেখে আলো পড়ার দিক ঠিক করুন, যেন ছায়া না পড়ে
- চারটা কোণ ছবির ভেতরে রাখুন, কাটা পড়লে সমস্যা
- ফাইল সাইজ সীমার ভেতরে আছে কিনা দেখুন। পোর্টালে সর্বোচ্চ সাইজ লেখা থাকে, আমি সাধারণত প্রতিটি ফাইল এক এমবির নিচে রেখেছি
আমার একটা ভুল: প্রথমবার ফোনের ক্যামেরায় সরাসরি ছবি তুলে আপলোড করতে গিয়েছিলাম। ফাইল ছিল চার এমবির মতো, পোর্টাল নিল না। কমপ্রেস করে আবার তুলতে হলো, এক ঘণ্টা নষ্ট।
ঘরে বসে অনলাইনে ইংরেজি আবেদন করবেন কীভাবে?
আবেদন করতে হয় সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টাল bdris.gov.bd থেকে। নিচের ক্রম মেনে চলুন। প্রতিটি ধাপ আমি নিজে করে দেখেছি।
ধাপ ১: পোর্টালে ঢুকুন
ব্রাউজারে সরাসরি ঠিকানা লিখুন। গুগলে খুঁজে যেকোনো লিংকে ঢুকবেন না, নকল সাইট থেকে সাবধান। ঠিকানা শেষ হবে gov.bd দিয়ে।
ধাপ ২: সংশোধন আবেদন অপশনে যান
মেনু থেকে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন বেছে নিন। ইংরেজি তথ্য যোগ করাও এই আবেদনের মধ্যেই পড়ে। সংশোধনের বাকি নিয়ম আলাদা করে লিখেছি জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের নিয়ম লেখায়।
ধাপ ৩: নম্বর ও জন্মতারিখ দিন
১৭ ডিজিটের নম্বরটি ভুল ছাড়া দিন। জন্মতারিখ সনদের মতোই দিন, দিন বা মাস উল্টে গেলে তথ্য মিলবে না।
ধাপ ৪: নিবন্ধন কার্যালয় বেছে নিন
যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে সনদ নিয়েছিলেন, সেটাই বেছে নিন। অন্য কার্যালয় বাছলে আবেদন আটকে যাবে।
ধাপ ৫: ইংরেজি তথ্য লিখুন
এই ঘরগুলো ইংরেজিতে পূরণ করতে হবে:
- আপনার নাম
- বাবার নাম
- মায়ের নাম
- জন্মস্থানের ঠিকানা
- স্থায়ী ঠিকানা
সবগুলো নাম এসএসসি সনদ আর জাতীয় পরিচয়পত্রের বানানের সাথে মিলিয়ে লিখুন। বাংলা ধ্বনির ইংরেজি বানান একাধিক হতে পারে। “মোহাম্মদ” কে কেউ Mohammad লেখে, কেউ Muhammad।
Pro Tip: আমি আবেদনের আগে এসএসসি সনদ আর জাতীয় পরিচয়পত্র পাশাপাশি রেখে বানান একটা সাদা কাগজে টুকে নিয়েছিলাম। তিনটা বানান পাশাপাশি দেখলে অমিল চোখে পড়ে। এই ছোট কাজটাই পরে পাসপোর্ট অফিসের ঝামেলা বাঁচিয়েছে।
ধাপ ৬: কাগজ আপলোড করুন
পোর্টালের নির্দেশ অনুযায়ী ফাইল আপলোড করুন। সব ফাইল পরিষ্কার ও সাইজ সীমার ভেতরে কিনা আরেকবার দেখে নিন।
ধাপ ৭: ফি পরিশোধ করুন
ফি কীভাবে দেবেন, তা নিচের আলাদা অংশে লিখেছি।
ধাপ ৮: প্রিন্ট কপি নিয়ে অফিসে জমা দিন
আবেদন শেষ হলে একটা প্রিন্ট কপি পাবেন। সেটি এবং প্রয়োজনীয় কাগজ স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয়ে জমা দিন। নিবন্ধক যাচাই করে অনুমোদন দিলে আপনার ইংরেজি সনদ প্রস্তুত হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটা চোখের সামনে দেখতে চান?
স্ক্রিনে ধাপগুলো দেখে নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। নিচের ভিডিওটা দেখে নিন।
জন্ম নিবন্ধন ইংরেজি করতে কত টাকা লাগে এবং ফি জমা দেবেন কীভাবে?
সরকারি ফি সাধারণত অল্প, প্রায় ১০০ টাকার মতো দেখানো হয়। তবে ফি আবেদনের সময় পোর্টালেই দেখায়, তাই সেখানকার অঙ্কটাই চূড়ান্ত ধরুন।
ফি দেওয়া হয় অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে। পোর্টালে যে অপশনগুলো দেখাবে, তার মধ্যে সাধারণত থাকে:
- মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন বিকাশ বা নগদ)
- ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড
- ব্যাংকের অনলাইন সেবা
আগে ব্যাংকে গিয়ে চালান জমা দিতে হতো। এখন সাধারণত সেই ঝামেলা লাগে না, তবে পোর্টালে যে নির্দেশ দেখাবে সেটাই মানুন। পেমেন্ট শেষ হলে স্ক্রিনে বা মোবাইলে আসা নিশ্চিতকরণ বার্তাটা রেখে দিন।
সরকারি ফির বাইরে বাড়তি খরচ হয় তিন জায়গায়:
- ফটোকপি আর স্ক্যানের খরচ
- ইন্টারনেট ক্যাফে বা কম্পিউটার দোকানের সার্ভিস চার্জ
- যাতায়াত খরচ
“দ্রুত করে দেওয়ার” নামে সরকারি ফির বাইরে টাকা চাইলে সাবধান। রশিদ ছাড়া কাউকে টাকা দেবেন না।
কতদিন সময় লাগে?
কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই। কাগজপত্র ঠিক থাকলে কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে কাজ হতে পারে। নিবন্ধক ছুটিতে থাকলে বা তথ্যে অমিল থাকলে বেশি লাগে।
আমার ক্ষেত্রে জমা দেওয়ার পর কার্যালয়ে দুবার যেতে হয়েছিল। প্রথমবার নিবন্ধক ছিলেন না। তাই যাওয়ার আগে ফোন করে জেনে নিন।
আবেদন কোথায় আছে, তা দেখতে জন্ম নিবন্ধন আবেদনের স্ট্যাটাস দেখার নিয়ম কাজে লাগবে। দুই-তিন কার্যদিবস পরপর দেখে নিন।
ঢাকা বা অন্য শহরে থাকলে আবেদন কোথায় জমা দেবেন?
গ্রাম ও শহরে জমা দেওয়ার জায়গা আলাদা। আপনার সনদ যে কার্যালয় থেকে ইস্যু হয়েছে, আবেদন সেখানেই যাবে।
| এলাকা | সাধারণত কোথায় জমা দেবেন |
|---|---|
| গ্রাম | ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় |
| পৌর এলাকা | পৌরসভা কার্যালয় |
| সিটি কর্পোরেশন (যেমন ঢাকা উত্তর বা দক্ষিণ) | নির্ধারিত জোনাল অফিস বা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় |
সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ড বা জোন ভেদে কার্যালয় আলাদা হতে পারে। যাওয়ার আগে নিজের ঠিকানায় কোন অফিস পড়ে, ফোন করে জেনে নিন। ভুল অফিসে গেলে পুরো দিনটাই যায়।
ইংরেজি নাম এনআইডি বা এসএসসির সাথে না মিললে কী করবেন?
পাসপোর্ট বা ভিসার আবেদনে জন্ম নিবন্ধন, এসএসসি সনদ আর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য হুবহু মিলতে হয়। একটা কাগজে “Md.” আরেকটায় “Mohammad” থাকলে ঝামেলা হয়।
ক্রম এই রকম রাখুন:
- আগে দেখুন কোন কাগজে নামের বানান সবচেয়ে আগে ঠিক হয়েছে, সাধারণত এসএসসি সনদ
- জন্ম নিবন্ধনের ইংরেজি নাম সেই বানানের সাথে মিলিয়ে দিন
- এনআইডিতে ভুল থাকলে সেটা আলাদা সংশোধনের বিষয়, দেখুন জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগের নির্দেশনা
- সব কাগজ মিললে তবেই পাসপোর্টের আবেদনে যান। নিয়মের হালনাগাদ দেখুন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাইটে
এসএসসি সনদের বানান ভুল থাকলে সেটা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে ঠিক করতে হয়। সেটা জন্ম নিবন্ধনের চেয়ে আলাদা, ধীর প্রক্রিয়া, তাই আগে শুরু করুন।
আবেদন বাতিল বা Rejected দেখালে কী করবেন?
স্ট্যাটাস চেকে “Rejected” বা বাতিল দেখালে ঘাবড়ে যাবেন না। বেশিরভাগ সময় কাগজের ঘাটতি বা তথ্যের অমিলের কারণে এমন হয়।
কয়েকটা সাধারণ কারণ:
- ফাইল ঝাপসা বা পড়া যাচ্ছে না
- ইংরেজি নামের বানান অন্য প্রমাণপত্রের সাথে মেলেনি
- জন্মতারিখ বা নম্বরে টাইপ ভুল
- ভুল কার্যালয় নির্বাচন
ইউনিয়ন পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গিয়ে সচিব বা নিবন্ধকের সাথে কথা বললে তিনি বাতিলের কারণ জানাতে পারবেন। কারণ জেনে ঠিক করে নতুন করে আবেদন করুন। একই ভুল বারবার করলে একই ফল আসবে।
প্রবাসে থাকলে কী করবেন?
বিদেশে থেকে ইংরেজি করতে চাইলে একই পোর্টাল ব্যবহার করা যায়। তবে প্রিন্ট কপি জমার জন্য দেশে বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দিতে হতে পারে। প্রবাসীদের নিয়মগুলো গুছিয়ে লিখেছি প্রবাসীদের জন্ম নিবন্ধনের নিয়ম লেখায়।
পিতা-মাতার নিবন্ধন না থাকলে আবেদনে আলাদা জটিলতা আসে। এই পরিস্থিতির জন্য দেখুন পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলে করণীয়।
কোন পথে গেলে কেমন খরচ আর সময়?
| পদ্ধতি | খরচ | সময় | ঝুঁকি |
|---|---|---|---|
| নিজে অনলাইনে আবেদন | সরকারি ফি ও সামান্য আনুষঙ্গিক খরচ | কয়েক কার্যদিবস | কম, নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ |
| ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় সরাসরি | সরকারি ফি ও যাতায়াত | নিবন্ধকের সময়ের ওপর নির্ভর | মাঝারি, কাগজ ফেরত আসতে পারে |
| দালাল বা তৃতীয় পক্ষ | বাড়তি অতিরিক্ত টাকা | অনিশ্চিত | বেশি, তথ্য ভুল হওয়ার আশঙ্কা |
জমা দেওয়ার আগে শেষবার মিলিয়ে নিন
- ১৭ ডিজিটের নম্বর ও জন্মতারিখ ঠিক আছে
- ইংরেজি নামের বানান এসএসসি সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিলেছে
- বাবা ও মায়ের নামের বানান যাচাই করা হয়েছে
- সব ফাইল পরিষ্কার ও সাইজ সীমার ভেতরে
- ফি দেওয়ার নিশ্চিতকরণ বার্তা সংরক্ষণ করা হয়েছে
- আবেদনের প্রিন্ট কপির দুটি করে ফটোকপি করা হয়েছে
- নিবন্ধকের সাথে ফোনে কথা বলে যাওয়ার সময় নেওয়া হয়েছে
সনদ হাতে পাওয়ার পর কী কী করে রাখবেন?
অনুমোদনের পর সনদ হাতে পেয়েই ফাইলে ঢুকিয়ে ফেলবেন না। আমার ভাইয়ের ক্ষেত্রে আসল ঝামেলা শুরু হয়েছিল সনদ হাতে পাওয়ার পরে।
প্রথম ১০ মিনিটে কী মিলিয়ে নেবেন?
ইংরেজি অংশটা প্রতিটি অক্ষর ধরে পড়ুন। একটা বানান ভুল থাকলে পরে সেটা ঠিক করতে নতুন করে আবেদন লাগে।
এই চারটা জায়গা আলাদা করে দেখুন:
- আপনার নামের বানান
- বাবার নামের বানান ও পদবি
- মায়ের নামের বানান
- জন্মতারিখের ফরম্যাট
এরপর everify পোর্টালে নম্বর বসিয়ে অনলাইনের তথ্যের সাথে হাতের কপি একবার মিলিয়ে নিন।
নামের বানানের “মাস্টার শিট” বানান
একটা কাগজে নিজের ইংরেজি নাম লিখুন। তার পাশে লিখুন, কোন কাগজে সেটা কীভাবে লেখা: জন্ম সনদ, এসএসসি, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট।
এক বন্ধুর জন্ম সনদে নাম ছিল Mohammad, এসএসসিতে Muhammad। পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে তাকে একটাকে “সঠিক” ধরে বাকিগুলো বদলাতে হয়েছিল। সংশোধনে তার প্রায় দুই সপ্তাহ গেছে।
আমি এখন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য একটা করে পাতা রাখি। বিদেশের ফর্ম পূরণের সময় এই পাতাটাই সবচেয়ে কাজে লাগে।
ডিজিটাল কপি কোথায় রাখবেন?
| সংরক্ষণের জায়গা | সুবিধা | অসুবিধা |
|---|---|---|
| ফোনের গ্যালারি | চাইলেই হাতের কাছে | ফোন হারালে বা ফরম্যাট হলে সব যায় |
| ইমেইলে নিজেকে পাঠানো | যেকোনো ডিভাইস থেকে খোলা যায় | অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে ঝুঁকি |
| পেনড্রাইভ | ইন্টারনেট ছাড়াই চলে | হারিয়ে যেতে বা নষ্ট হতে পারে |
| ক্লাউড স্টোরেজ | ফোন হারালেও থাকে | পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে আটকে যেতে পারে |
আমি তিন জায়গায় রাখি: ইমেইল, পেনড্রাইভ আর একটা প্রিন্ট। একটা মাধ্যম নষ্ট হলে বাকি দুটো থেকে কাজ চলে যায়। মোবাইলে সনদ নামানোর ধাপগুলো আছে মোবাইল দিয়ে জন্ম নিবন্ধন ডাউনলোডের নিয়ম লেখায়।
ফাইলের নামও গুছিয়ে দিন। “scan1” লিখে রাখলে তিন মাস পরে নিজেই চিনবেন না। “জন্ম সনদ ইংরেজি পূর্ণ নাম” ধরনের নাম দিন।
সংখ্যায় মনে রাখুন: সনদের অন্তত তিনটা প্রিন্ট রাখুন। একটা নিজের ফাইলে, একটা বিশ্বস্ত আত্মীয়ের কাছে, একটা ভ্রমণের ব্যাগে। ডিজিটাল কপি রাখুন কমপক্ষে দুই জায়গায়।
প্রিন্ট দেওয়ার সময় যা এড়াবেন
ঝাপসা প্রিন্ট হলে ভিসা অফিস বা দূতাবাস কপি ফিরিয়ে দিতে পারে। সাদা, মোটা এ-ফোর কাগজে পরিষ্কার প্রিন্ট নিন। কালির দাগ বা ভাঁজ রাখবেন না, প্লাস্টিক ফাইলে ঢুকিয়ে রাখুন।
আবেদনের স্ক্রিনশট রাখুন
প্রতিটি ধাপের স্ক্রিনশট নিন। আবেদন নম্বর, ফি পরিশোধের বার্তা, জমার তারিখ, সব। অফিসে কেউ “আপনার আবেদন আমাদের কাছে নেই” বললে এই স্ক্রিনশটই আপনার প্রমাণ।
আমি একবার ফি পরিশোধের বার্তা ডিলিট করে ফেলেছিলাম। পরে কার্যালয়ে রশিদ খুঁজতে অনেক সময় গেছে।
বিদেশে যাচ্ছেন? ইংরেজি সনদের পর আরেকটা ধাপ থাকতে পারে

ইংরেজি সনদ নেওয়ার পর বিদেশের ভিসা, পড়াশোনা বা চাকরির জন্য সনদটা সত্যায়ন করাতে হতে পারে। এই সত্যায়নের নাম অ্যাপোস্টিল (Apostille)।
বাংলাদেশে এখন এই সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়, দেখাশোনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধনসহ শিক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, বিবাহ ও এনআইডি সনদও এর আওতায় পড়ে।
অ্যাপোস্টিল কোন কোন ক্ষেত্রে লাগে?
যে দেশে যাচ্ছেন, সেটা অ্যাপোস্টিল কনভেনশনের সদস্য হলে মন্ত্রণালয়ের অ্যাপোস্টিলই সাধারণত যথেষ্ট। আগে অনেক ক্ষেত্রে ঢাকায় ওই দেশের দূতাবাসে গিয়েও সত্যায়ন করাতে হতো।
যে দেশ কনভেনশনের সদস্য না, সেখানে দূতাবাসের মাধ্যমে আলাদা বৈধতা লাগতে পারে। গন্তব্য দেশের দূতাবাস বা ভিসা অফিসের তালিকা আগে দেখে নিন, কারণ চাহিদা দেশ ও প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা।
প্রক্রিয়াটা মোটামুটি কেমন?
সাধারণ ক্রমটা এই রকম:
- অনলাইনে অ্যাপোস্টিলের আবেদন করুন
- মূল সনদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করে
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অ্যাপোস্টিল ইস্যু করে
- নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বার্তা আসে
ফি, ধাপ ও সময় বদলাতে পারে, তাই আবেদনের আগে মন্ত্রণালয়ের সাইটের হালনাগাদ নির্দেশ দেখে নিন। অ্যাপোস্টিলের জন্য আপনার ইংরেজি সনদটা সিস্টেমে ঠিকঠাক থাকা জরুরি, তাই জন্ম নিবন্ধনের তথ্য আগে নির্ভুল করে নিন।
Image Here—————–
যেসব ভুলে মানুষ সবচেয়ে বেশি আটকে যায়
এই ভুলগুলো ছোট মনে হয়। কিন্তু ভিসার তারিখ বা ভর্তির শেষ দিন যখন কাছে, তখন একটা ছোট ভুলই সপ্তাহখানেক পিছিয়ে দিতে পারে।
শেষ মুহূর্তে শুরু করা
বেশিরভাগ মানুষ ইংরেজি সনদের কথা মনে করেন একদম প্রয়োজনের আগে। তখন কাগজ জোগাড়, আবেদন, অনুমোদন, সবকিছু একসাথে চেপে ধরে। আমি জানি, তখন মাথার ভেতরে কী চলে।
অন্তত এক মাস আগে শুরু করুন। হাতে সময় থাকলে একটা ভুল ধরা পড়লেও সংশোধনের সুযোগ থাকে।
নকল সাইট আর অচেনা মধ্যস্থতাকারীর ওপর ভরসা
গুগলে খুঁজলে অনেক সাইট আসে। সবগুলো সরকারি না। যে সাইটে আপনার নম্বর, জন্মতারিখ বা পেমেন্টের তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তার ঠিকানা gov.bd দিয়ে শেষ হচ্ছে কিনা দেখুন।
“টাকা দিলে এক দিনে করে দেব” ধরনের প্রস্তাব থেকে দূরে থাকুন। এতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের হাতে যায়, কাজ হবে কিনা তারও ঠিক নেই।
বানান না মিলিয়েই আবেদন করা
এটা সবচেয়ে বেশি দেখেছি। ইংরেজি ঘরে যা মনে এল, তাই লিখে দেওয়া। পরে দেখা যায়, পাসপোর্টে এক বানান, সনদে আরেক। ফল আরেকবার সংশোধন, আরেকবার ফি, আরেকবার অফিসে দৌড়।
আবেদন জমা দিয়ে আর খোঁজ না নেওয়া
হয়তো কাগজে একটা ঘাটতি ছিল, নিবন্ধক ফেরত পাঠিয়েছেন, কিন্তু আপনি জানেনই না। কয়েক দিন পরপর স্ট্যাটাস দেখা অভ্যাস করুন।
ইংরেজি তথ্য আর নতুন নাম গুলিয়ে ফেলা
ইংরেজি করা মানে বাংলা নামের ইংরেজি রূপ বসানো। কেউ কেউ এই সুযোগে ডাকনাম বা একেবারে নতুন বানান ঢুকিয়ে দিতে চান। এতে আবেদন আটকে যেতে পারে, কারণ নাম পরিবর্তনের নিয়ম আলাদা ও কড়া।
ইংরেজি জন্ম নিবন্ধন নিয়ে তিনটি ভুল ধারণা
“ইংরেজি সনদ মানে আলাদা একটা নিবন্ধন।” না। নিবন্ধন একটাই। সিস্টেমে ইংরেজি তথ্য যুক্ত হলে একই নম্বরে ইংরেজি ভার্সন পাওয়া যায়।
“টাকা দিলে এক দিনে হয়ে যায়।” যাচাই ও অনুমোদন ছাড়া সনদ তৈরি হয় না। বাড়তি টাকা দিলে ঝুঁকিও বাড়ে।
“এই সুযোগে নামটাও পাল্টে ফেলা যায়।” যায় না। নাম পরিবর্তন আলাদা প্রক্রিয়া, ইংরেজি করার আবেদনে সেটা হয় না।
করণীয়-বর্জনীয় এক নজরে
করবেন:
- আবেদনের আগে সনদ যাচাই করবেন
- সব নামের বানান আগে লিখে মিলিয়ে নেবেন
- প্রতিটি রশিদ ও বার্তা সংরক্ষণ করবেন
- অফিসে যাওয়ার আগে ফোন করে সময় জেনে নেবেন
করবেন না:
- অচেনা লিংকে নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না
- রশিদ ছাড়া কাউকে টাকা দেবেন না
- অনুমোদনের আগেই ভিসা বা ভর্তির তারিখ নির্ধারণ করবেন না
- একটা কপির ওপর ভরসা করে বসে থাকবেন না
কোনো ধাপই ১০০ ভাগ নিশ্চিন্ত করার গ্যারান্টি দেয় না। তবে এই অভ্যাসগুলো ভুলের ঝুঁকি অনেকটাই কমায়, আর সমস্যা হলে আপনার হাতে প্রমাণ থাকে।
জন্ম নিবন্ধন ইংরেজি করা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সবাই করে
জন্ম নিবন্ধন ইংরেজি করতে কি অফিসে যেতেই হয়?
হ্যাঁ, সাধারণত অন্তত একবার যেতে হয়। অনলাইনে আবেদনের পর প্রিন্ট কপি ও কাগজ স্থানীয় কার্যালয়ে জমা দিতে হয়, যাতে নিবন্ধক যাচাই করে অনুমোদন দিতে পারেন। প্রবাসে থাকলে দেশে বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দিতে হতে পারে।
ইংরেজি করার পর কি জন্ম নিবন্ধন নম্বর বদলে যায়?
সাধারণত না। নিবন্ধন একই থাকে, সিস্টেমে ইংরেজি তথ্য যোগ হয় মাত্র। তবু হাতে পাওয়া কপির নম্বর একবার মিলিয়ে নেবেন।
আমার সনদে ইংরেজি তথ্য আছে কিনা বুঝব কীভাবে?
everify পোর্টালে ১৭ ডিজিটের নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে দেখুন। ইংরেজি নাম ও ঠিকানা দেখালে তথ্য আছে। না দেখালে সংশোধনের আবেদন করতে হবে।
মোবাইল দিয়ে কি আবেদন করা যায়?
হ্যাঁ, যায়। তবে ফাইল আপলোড ও ফর্ম পূরণ কম্পিউটারে সহজ। মোবাইলে করলে ছবির সাইজ আর ছোট ঘরে টাইপের ভুল নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকুন।
ইংরেজিতে ভুল বানান এলে কী করব?
আবার সংশোধনের আবেদন করতে হবে। এ কারণেই আবেদনের আগে বানান মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। সংশোধনেও আলাদা ফি ও কাগজ লাগতে পারে।
বিদেশে যেতে ইংরেজি সনদ ছাড়া কি অ্যাপোস্টিলও লাগে?
গন্তব্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানের শর্তের ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে লাগে, তাই ভিসা অফিস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা আগে দেখে নিন।
আজই যে কাজগুলো গুছিয়ে রাখবেন
ইংরেজি জন্ম নিবন্ধন করা ভয় পাওয়ার মতো কঠিন কাজ না। কাগজপত্র গুছিয়ে, বানান মিলিয়ে ধাপে ধাপে এগোলে সাধারণ মানুষই নিজে করে নিতে পারেন। দালালের হাতে না গিয়ে নিজে করলে খরচও কমে, তথ্যও নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
আজ সন্ধ্যার মধ্যে এই চারটা কাজ সেরে রাখুন:
- everify পোর্টালে নিজের সনদ যাচাই করুন
- নামের বানানের মাস্টার শিট বানান
- প্রয়োজনীয় কাগজ স্ক্যান করে এক ফোল্ডারে রাখুন
- bdris পোর্টালে আবেদন শুরু করুন
প্রথমবার এই কাজ করতে গিয়ে আমি ভেবেছিলাম, মাস লেগে যাবে। শুরু করার পর বুঝলাম, কঠিন ছিল শুধু প্রথম ধাপটা ধরা। আপনিও আজই শুরু করুন, বাকিটা ধীরে ধীরে এগোবে।
একটা কথা বলে রাখি। আমি নিজে এই ঝামেলায় পড়া একজন সাধারণ মানুষ, নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তা বা আইন বিশেষজ্ঞ না। তাই আবেদনের আগে আপনার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ সচিব বা পৌরসভার নিবন্ধকের সাথে একবার কথা বলে কাগজপত্র আর ফি জেনে নেওয়াই ভালো, কারণ নিয়ম কার্যালয়ভেদে একটু আলাদা হতে পারে।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!










