মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুটো কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ৩ নভেম্বর ২০২৬ (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত ভোটের ফল স্পষ্ট হতে শুরু করে ৪ নভেম্বর (বুধবার)। সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে একে ট্রাম্প-যুগের প্রভাব কমে আসার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
Quick Answer:
- প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ২২৫ আসন এবং রিপাবলিকানরা ১৩৮ আসন পেয়েছেন। বাকি আসনের ফল তখনো ঘোষণা হয়নি।
- সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের দখলে ৫৪টি এবং রিপাবলিকানদের দখলে ৪৪টি আসন।
- জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস বসার পর ট্রাম্প প্রশাসন তদন্ত ও নিয়োগ নিয়ে নতুন বাধার মুখে পড়বে।
ফলাফলের চিত্র
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য লাগে ২১৮টি আসন। বাকি আসনের ফল ঘোষণার আগেই ডেমোক্র্যাটরা এই সংখ্যা পেরিয়ে গেছেন।
সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে এবার ৩৫টিতে ভোট হয়েছে। নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের ছিল ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি আসন। দুই স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দেওয়ায় সিনেটের ভারসাম্য আরও বদলে গেছে।
জাতীয় ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাবে ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো দলের এটাই সবচেয়ে বড় ব্যবধান। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামার সময়ে রিপাবলিকানদের যে জয় হয়েছিল, এবারের ব্যবধান তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে আসন পুনর্নির্ধারণের কারণে এই ভোটের ব্যবধান আসন সংখ্যায় পুরোপুরি রূপ নাও পেতে পারে।
ভোটারদের অসন্তোষের কারণ
জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ ও সমাধানহীন যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য মুনাফার অভিযোগ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করেছে। যাঁরা পরিবর্তনের আশায় ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা এবার হয় দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, নয়তো ভোটকেন্দ্রেই যাননি।
অনেক ভোটার মনে করছেন, ট্রাম্প জিনিসপত্রের দাম কমাবেন এবং নতুন যুদ্ধে জড়াবেন না। সেই আশা পূরণ না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর গ্রেপ্তার অভিযান এবং ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া আমদানি শুল্কনীতির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনেকে। রয়টার্স/ইপসসের এক জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নেমেছিল ৩১ শতাংশে, যা তাঁর দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন।
দলের ভেতরের চাপ ও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ
প্রার্থী বাছাইয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ দলের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি করেছিল। টেক্সাসের সিনেটর প্রার্থী কেন প্যাক্সটন এবং দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সিনেটর প্রার্থী ডারলিন গ্রাহাম, দুজনই হেরেছেন। দুজনকেই ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করেছিলেন।
আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণে রিপাবলিকানদের সুবিধা করে দিতে ট্রাম্পের দেওয়া চাপও উল্টো ফল দিয়েছে। নিজের দলের কাছ থেকে তিনি শতভাগ আনুগত্য দাবি করেছিলেন, যা প্রার্থীদের পক্ষে তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব রাখা কঠিন করে তুলেছিল।
ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, তিনি নিজে ব্যালটে ছিলেন না, আর সেই কারণেই যথেষ্ট ভোটারকে কেন্দ্রে আনা যায়নি। তবে নির্বাচনের প্রচার পুরোটাই তাঁকে ঘিরে ছিল, এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সিদ্ধান্তও তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। ফলে এই ব্যাখ্যা নিয়ে রিপাবলিকানদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।
ট্রাম্পের হাতে এখনো কী আছে
জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস বসার পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারেন। প্রয়োজনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের সামনে ডাকা হতে পারে। অভিশংসনের প্রশ্নও উঠতে পারে, তবে ট্রাম্পকে পদ থেকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন লাগবে, যা বর্তমান হিসাবে কঠিন।
আইন পাস ও বাজেট অনুমোদনে কংগ্রেসের সম্মতি লাগবে, যা ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাঁর বিভিন্ন নিয়োগেও বাধা আসতে পারে। তবে চ্যাথাম হাউসের গবেষক লরেল র্যাপের মতে, বিদেশনীতি, সেনা মোতায়েন ও যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের হাতে এখনো বড় ক্ষমতা রয়েছে। হোয়াইট হাউস নতুন শুল্ক ও ভিসার শর্ত কঠোর করার মতো নির্বাহী পদক্ষেপ নিয়েও ভাবছে বলে জানা গেছে।
ইতিহাস কী বলে
১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ে মনে হয়েছিল রিপাবলিকানরা দীর্ঘ সময়ের জন্য কোণঠাসা হবেন। কিন্তু ছয় বছর পরেই রোনাল্ড রিগ্যান দলকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনেন। একইভাবে ১৯৯৪ ও ২০১০ সালের রিপাবলিকান জয় ক্লিনটন ও ওবামার শেষের ইঙ্গিত দিলেও, দুজনই দুই বছর পর আবার নির্বাচিত হন।
ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্লেষক লিন ভাভরেকের মতে, এবারের ফলের সবচেয়ে বড় নিয়ামক ছিল জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি। তাই এটিকে দেশের রাজনৈতিক চরিত্রে স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে দেখা কঠিন। তাঁর মতে, এর মানে মাগা (MAGA) আন্দোলন ভেঙে পড়ছে না, তবে ট্রাম্পের আগের জনপ্রিয়তা কিছুটা ম্লান হয়েছে।
দলগুলোর সামনে এখন কী
রিপাবলিকানদের একাংশ মনে করছেন, এই পরাজয়ের সমাধান হলো দলকে আবার আগের নীতিমালায় ফিরিয়ে আনা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নীতি উপদেষ্টা জো গ্রোগানের মতে, দল আর আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে না। তাঁর মতে, ট্রাম্প এমন কিছু বিষয়কে সামনে এনেছেন, যেমন ভালো বাণিজ্যচুক্তি ও ন্যাটো সহযোগীদের সামরিক ব্যয় বাড়ানো, যা আগে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
ডেমোক্র্যাটদের ভেতরেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রগতিশীলদের মতে, বামপন্থীদের উদ্যমই এই জয়ের চালিকা শক্তি ছিল। মধ্যপন্থীদের মতে, টেক্সাস ও কানসাসের মতো রাজ্যে ক্ষুব্ধ রিপাবলিকানদের কাছে টানাটাই মূল ভূমিকা রেখেছে। সাবেক ডেমোক্র্যাট শিকাগোর মেয়র রাম ইমানুয়েল বলেছেন, মূল প্রশ্ন হলো এই নির্বাচনকে সাময়িক লেনদেন হিসেবে দেখা হবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তর হিসেবে। তাঁর মতে, ২০২৭ সালে নেওয়া পদক্ষেপগুলোই সেটা ঠিক করে দেবে।
২০২৮ নির্বাচনের হিসাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই বড় পরাজয় মানেই ২০২৮ সালে ট্রাম্পের দলের পুনর্নির্বাচনের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশ মনে করেন, ট্রাম্পের সমালোচকেরা আগেও তাঁর রাজনৈতিক বিদায়ের কথা বলেছেন এবং প্রতিবারই ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। তাঁর মতে, রিপাবলিকানরা নীতিমালায় ফিরে গেলে ২০২৮ সালে জয় সম্ভব।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের নামও মনোনয়নের আলোচনায় উঠে আসতে পারে। ভ্যান্সের জন্য ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির কঠিন সিদ্ধান্ত এখন সামনে। আর ডেমোক্র্যাটরা আগামী দুই বছরে ভোটারদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, মার্কিন ভোটাররা এমন নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন যা মানুষকে আরও দরিদ্র করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা একে ‘নতুন যুগের সূচনা’ বলেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, এই ফল ওয়াশিংটন-তেহরান শত্রুতায় পরিবর্তন আনবে না।
ফল এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। বাকি আসনের ফল ঘোষণা হলে ছবিটি বদলাতে পারে। নতুন তথ্য এলে এই প্রতিবেদনে যোগ করা হবে।










