যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ ছয় মাস পার করেছে। এই ছয় মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয়ে গেছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, যুদ্ধ এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আরো পড়ুন: একদিকে সৌদি আরবে হামলা বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন বৈঠকে হুথিরা
সংক্ষেপে:
- যুদ্ধের বয়স ৬ মাস পেরিয়েছে, খরচ ৩৮ বিলিয়ন ডলার, মাসে বাড়ছে আরও ৩ বিলিয়ন
- হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্পের দাবি — তেহরানের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ চলছে
- ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা মেলেনি
- চীনের মধ্যস্থতা চেষ্টা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান
তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি ট্রাম্পের
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী এবং যুদ্ধ ক্রমেই থিতিয়ে আসছে। ইরানের কাছ থেকে কোনো বার্তা পেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথাবার্তা হচ্ছে।
তবে যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত কোনো শান্তিচুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি, আর ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে ইরানের পক্ষ থেকেও কোনো সরকারি বিবৃতি মেলেনি। আগে বিভিন্ন সময়ে তেহরান সরাসরি আলোচনার প্রশ্নে সতর্ক অবস্থান নিয়ে এসেছে, ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে এখন পর্যন্ত।
একই সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। বুধবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষকেই সংযম দেখিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান এবং গত জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতার কাঠামোয় ফিরে যাওয়ার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর নেতা বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হতে পারে, যেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল এখনো এই সংকট নিরসনের অন্যতম বড় বাধা। কয়েক মাসের সংঘাতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি করিডোরে নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে নয়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও পড়েছে।
ছয় মাসে যুদ্ধের যে মূল্য দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ট্রাম্প শুরুতে বলেছিলেন তা মাত্র কয়েক সপ্তাহেই শেষ হবে। কিন্তু সরকারি হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। যুদ্ধের ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যেসব প্রভাব পড়েছে:
- মোট যুদ্ধ-ব্যয়: ৩৮ বিলিয়ন ডলার, প্রতি মাসে আরও ৩ বিলিয়ন ডলার যোগ হচ্ছে
- ডিজেলের দাম রেকর্ড গড়ে প্রতি গ্যালন ৬.২৭ ডলারে পৌঁছেছে
- শুধু জ্বালানি বাবদ আমেরিকানদের অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলার
- প্রতিটি পরিবারের ঘাড়ে গড়ে প্রায় ৭৬৩ ডলারের বাড়তি ঋণের বোঝা চেপেছে
- জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদিপণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর দামও বেড়েছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে
- গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কড়াকড়ির কারণে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ আটকে যাওয়াই এই জ্বালানি সংকটের মূল কারণ বলে জানা গেছে।
সামরিক দিক থেকেও চাপে আছে যুক্তরাষ্ট্র। একটানা বোমাবর্ষণের কারণে দেশটির অস্ত্রভান্ডার প্রায় শেষের পথে। পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মজুত আগের অবস্থায় ফেরাতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও পড়েছে যুদ্ধের ছায়া
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চ দামকে হাতিয়ার করে এই সুযোগে মাঠে নেমেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছে, আর যুদ্ধ নিয়ে জনসমর্থনও কমে মাত্র ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতাও বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন।
তবে হোয়াইট হাউসের অবস্থান হলো, নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ থেমে যাবে। ভোটারদের মন জয় করতে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জিতলে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়া হবে। কিন্তু পকেটের টান আর চড়া বাজারদর ভোটারদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি করেছে, বিশ্লেষকদের মতে সেই ক্ষোভই আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে — যুদ্ধ যত দ্রুতই শেষের দাবি আসুক না কেন, তার আর্থিক ক্ষত ভোটের বাক্সে সহজে মুছবে না বলেই মনে করছেন তাঁরা।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!










