নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলার পালশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬ দুপুরে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অন্তত ১৫ শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে অসমভাবে কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল বলেই তিনি কয়েকজনের চুল কেটে দিয়েছেন। ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এক নজরে
- কী ঘটেছে: অন্তত ১৫ শিক্ষার্থীর চুল অসমভাবে ও খোপ খোপ করে কেটে দেওয়ার অভিযোগ
- কোথায়: কোলার পালশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলা ইউনিয়ন, বদলগাছী, নওগাঁ
- কবে: ৭ নভেম্বর ২০২৬, শনিবার দুপুরে
- অভিযুক্ত: প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম
- অভিযোগ তুলেছেন: শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা
কোলার পালশা স্কুলে কী ঘটেছিল
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাথার চুল কাঁচি দিয়ে কাটা হয়। কাটার পর অনেক শিক্ষার্থীর চুল এলোমেলো ও খোপ খোপ হয়ে যায়, যার ফলে চুলের স্বাভাবিক আকৃতি নষ্ট হয়। ভিডিওতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর এমন চুল দেখা যাওয়ার পর তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এলাকায় আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। শনিবার বিদ্যালয়ে এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষের কথা-কাটাকাটি হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ
এক শিক্ষার্থীর বাবা মিলন বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। ফিরে এসে দেখেন, তাঁর ছেলের মাথার চুলও খোপ খোপ করে কাটা হয়েছে, অথচ আগে সেখানে স্বাভাবিক চুল ছিল।
আরেক অভিভাবক রকেট হোসেনের ভাষ্য, প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থীর চুল এভাবে কাটা হয়েছে। শীতের মধ্যে এমন কাটায় শিশুরা বিব্রত হয়েছে। তাঁর আরও অভিযোগ, এর আগে এক শিক্ষার্থীর ভ্রুর চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রধান শিক্ষক প্রায়ই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছেন।
অভিভাবক মিতু বানু বলেন, কয়েক দিন আগে তাঁর ছেলেকে এমনভাবে মারধর করা হয় যে তার দুই পা রক্তাক্ত হয়। এরপর থেকে শিশুটি ভয়ে বিদ্যালয়ে যেতে চায় না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিক্ষক এমন আচরণ করলে শিশুরা বিদ্যালয়ে নিরাপদ বোধ করবে কীভাবে। তবে এই মারধর ও আগের ঘটনার অভিযোগ এখনো স্বতন্ত্র সূত্রে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রধান শিক্ষকের ব্যাখ্যা
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের চুল অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল এবং তা চোখের ওপর এসে পড়ছিল। সে কারণেই কয়েকজনের চুল কেটে দিয়েছেন।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা না বলে, কিংবা নাপিত ডেকে কাটানোর ব্যবস্থা না করে নিজে কেন চুল কাটলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দেখতে খারাপ লাগছিল, তাই কপালের ওপরের চুল কেটে দিয়েছেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
বদলগাছী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান জানান, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। তবে প্রশিক্ষণে থাকায় সরাসরি খোঁজ নিতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের চুল কেন এভাবে কাটা হলো, তা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিন তদন্ত করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, ঘটনাটি তাঁর নজরে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইন কী বলছে: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ
বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি আইনত নিষিদ্ধ। ২০১০ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST) ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। ওই আবেদনের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি সংবিধানে নিষিদ্ধ নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর শাস্তির পরিপন্থী।
এই রায়ের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় “Guidelines for the prohibition of corporal and mental punishment of students in educational institutions, 2011” বা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধকরণ নির্দেশিকা ২০১১ জারি করে। নির্দেশিকাটি ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে কার্যকর হয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য। আদালতের নির্দেশনায় শিক্ষকদের শাস্তিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে বিভাগীয় ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
এখন নজর তদন্তের দিকে
কেন শিক্ষার্থীদের চুল এভাবে কাটা হলো এবং অভিভাবকদের মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ কতটা সত্য, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়ার কথা। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকরা।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!









