গত বছর নির্বাচন অফিসে গিয়ে আমার এনআইডি কার্ডটা হাতে নিয়ে থমকে গিয়েছিলাম। ছবিতে যে মানুষটা, সেটা যেন আমি নই — বহু বছর আগে তোলা সেই ছবিতে চুলের স্টাইল থেকে চেহারার গড়ন, সবটাই বদলে গেছে। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে অফিসার দুইবার আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন, তারপর কার্ডের দিকে।
স্বাক্ষরটাও ঠিক মিলছিল না — তখনকার হাতের লেখা এখনকার সাথে আর এক রকম নেই। এই একটা ছোট্ট অমিলের কারণে সিম রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ব্যাংক লেনদেন পর্যন্ত প্রতিটা কাজে বাড়তি প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছিল। শেষে বুঝলাম, এটা ঠিক না করে আর উপায় নেই।
সংক্ষেপে উত্তর: এনআইডি বা ভোটার আইডি কার্ডের ছবি ও স্বাক্ষর বদলাতে হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে সংশোধন ফরম-২ জমা দিতে হয় (অনলাইনেও আবেদন শুরু করা যায়)। সরকারি ফি ২৩০ টাকা বিকাশ বা রকেটের মাধ্যমে পরিশোধ করে অফিসে গিয়ে নতুন ছবি ও স্বাক্ষর দিতে হয়। আবেদন অনুমোদিত হলে এসএমএসে জানানো হয়, তারপর অনলাইন থেকে নতুন কার্ড ডাউনলোড করা যায়।
এই সমস্যাটা আসলে অনেকের জীবনেই ঘটে। কারও ছবি তোলা হয়েছিল স্কুল-কলেজে থাকতে, কারও চেহারা বদলে গেছে অসুস্থতা বা বয়সের কারণে, আবার কারও স্বাক্ষরের স্টাইলই পুরোপুরি পাল্টে গেছে সময়ের সাথে সাথে।
এর প্রভাব শুধু বিরক্তিকর নয়, বাস্তবিক ঝামেলাও তৈরি করে:
- ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে যাচাইয়ে দেরি হয়
- চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে কার্ড দেখিয়ে বাড়তি প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়
- জমি বা সম্পত্তি সংক্রান্ত দলিলে স্বাক্ষর না মেলায় রেজিস্ট্রেশন আটকে যায়
- সিম কার্ড রেজিস্ট্রেশন বা পাসপোর্ট আবেদনে তথ্য অমিল দেখায়
এই ছোট ছোট বাধাগুলো একসাথে জমে গিয়ে মানসিক চাপ তৈরি করে — বিশেষ করে যখন জরুরি কোনো কাজ আটকে থাকে শুধু একটা পুরনো ছবি বা স্বাক্ষরের কারণে।
কোন কোন কারণে ছবি বা স্বাক্ষর পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়?

মূলত তিন ধরনের পরিস্থিতিতে এই সংশোধন দরকার হয়। প্রথমত, ছবি তোলার বহু বছর পর চেহারার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দ্বিতীয়ত, হাতের লেখার স্টাইল বদলে যাওয়ায় স্বাক্ষর না মেলা। তৃতীয়ত, প্রথমবার নিবন্ধনের সময় ছবি বা স্বাক্ষর অস্পষ্ট বা ভুলভাবে তোলা হয়েছিল।
অনলাইনে আবেদন করবেন, নাকি সরাসরি ফরম পূরণ করবেন?
আগে সবাই ম্যানুয়ালি ফরম-২ পূরণ করে অফিসে জমা দিতেন। এখন নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টাল-এ লগইন করে সরাসরি অনলাইনে “ছবি পরিবর্তন” অপশন বেছে আবেদন সাবমিট করা যায়, এরপর শুধু প্রিন্ট কপি নিয়ে অফিসে যেতে হয় — এতে অফিসে বসে ফরম পূরণের সময়টা বেঁচে যায়।
যাদের অনলাইনে আবেদন করতে সমস্যা হয়, তারা পোর্টাল থেকে ফরম ডাউনলোড করে হাতে পূরণ করেও জমা দিতে পারেন — দুটো পদ্ধতিই বৈধ, শুধু অনলাইনটা তুলনামূলক দ্রুত।
একটা প্রশ্ন প্রায়ই আসে — ছবি বা স্বাক্ষর বদলাতে কি থানায় জিডি করতে হয়? না। জিডি শুধু কার্ড হারিয়ে গেলে লাগে, ছবি বা স্বাক্ষর সংশোধনের জন্য এটার কোনো প্রয়োজন নেই।
আবেদন ফি আসলে কত, আর কীভাবে পরিশোধ করবেন?
মোট ফি ২৩০ টাকা — এর মধ্যে মূল ফি ২০০ টাকা, আর তার ওপর ১৫% ভ্যাট হিসেবে যোগ হয় ৩০ টাকা। এই ভাঙা হিসাবটা জানা থাকলে পেমেন্টের সময় কোনো বিভ্রান্তি হয় না।
ফি পরিশোধ করা যায় বিকাশের পে-বিল সেবা থেকে — “সরকারি ফি” অপশনে গিয়ে “NID Service” বেছে নিলেই পেমেন্ট সম্পন্ন হয়ে যায়। পেমেন্টের পর যে ডিজিটাল রিসিট পাবেন, সেটা স্ক্রিনশট নিয়ে ফোনে সেভ রাখুন — অফিসে জমা দেওয়ার সময় প্রমাণ হিসেবে এটা লাগবে।
কোন কোন কাগজপত্র সঙ্গে নিতে হবে?
আবেদনের সাথে নিচের কাগজপত্র লাগবে:
- বর্তমান এনআইডি কার্ডের ফটোকপি
- পূরণকৃত সংশোধন ফরম-২ (অনলাইনে করলে তার প্রিন্ট কপি)
- ফি পরিশোধের ডিজিটাল রিসিট
- ছবি বা স্বাক্ষর বদলের যৌক্তিক কারণ দেখানো প্রমাণপত্র (যেমন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কাগজ যেখানে বর্তমান স্বাক্ষর আছে, বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র)
বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়াটা আসলে কীভাবে হয়?
ছবি ও স্বাক্ষর আপনার প্রধান পরিচয়ের অংশ, তাই এটা ডিজিটাল সিস্টেমে যাচাই করতে সশরীরে অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই — সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর অফিসেই আপনার নতুন ছবি তোলা হবে এবং স্বাক্ষর নেওয়া হবে।
পড়ার চেয়ে দেখে শেখা সহজ মনে হলে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন। আবেদন ফরম জমা দেওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচন অফিসে গিয়ে ছবি ও স্বাক্ষর দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি এখানে স্টেপ-বাই-স্টেপ দেখানো হয়েছে।
ছবি তোলার দিন কী মাথায় রাখবেন?
সাদা বা হালকা ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি তোলা হয়, তাই একদম সাদা বা হালকা রঙের পোশাক না পরে গাঢ় রঙের জামা পরলে ছবি স্পষ্ট আসে। টুপি বা সানগ্লাস পরে ছবি তোলার অনুমতি নেই, চোখ ও মুখমণ্ডল পুরোপুরি স্পষ্ট থাকতে হবে।
প্রো টিপ: আমার নিজের ক্ষেত্রে প্রথমবার হালকা রঙের শার্ট পরে গিয়েছিলাম, ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে প্রায় মিশে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার গাঢ় নীল রঙের শার্ট পরে যাওয়ায় ছবিটা অনেক পরিষ্কার এসেছিল।
আবেদন অনুমোদন হতে কত দিন লাগে, স্ট্যাটাস কীভাবে দেখবেন?
সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসে। এসএমএসের জন্য বসে না থেকে নিজে থেকেও স্মার্ট কার্ডের স্ট্যাটাস চেক করার নিয়ম অনুসরণ করে পোর্টালে লগইন করে অগ্রগতি দেখে নিতে পারেন — সপ্তাহে একবার চেক করলে কোনো ধাপ আটকে থাকলে সেটা দ্রুত ধরা পড়ে।
অনুমোদনের পর নতুন কার্ড কীভাবে পাবেন?
অনুমোদনের এসএমএস পাওয়ার পর অনলাইন কপি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করার নিয়ম অনুসরণ করে PDF ফাইলটা রঙিন প্রিন্ট করে লেমিনেট করে সাময়িকভাবে ব্যবহার করা যায়। মূল প্লাস্টিক স্মার্ট কার্ডের জন্য নির্বাচন অফিস থেকে আলাদাভাবে জানানো হলে সেটা সংগ্রহ করতে হয়।
শুধু ছবি, শুধু স্বাক্ষর, নাকি দুটোই — পার্থক্য কোথায়?
| বিষয় | শুধু ছবি | শুধু স্বাক্ষর | ছবি ও স্বাক্ষর উভয়ই |
|---|---|---|---|
| সরকারি ফি | ২৩০ টাকা | ২৩০ টাকা | ২৩০ টাকা |
| ফরম-২-এ চিহ্নিতকরণ | শুধু ছবির ঘর | শুধু স্বাক্ষরের ঘর | দুটো ঘরই |
| প্রক্রিয়ার সময় | ২-৩ সপ্তাহ | ২-৩ সপ্তাহ | সাধারণত একই সময় |
আবেদন জমা দেওয়ার আগে দ্রুত চেকলিস্ট
- ফরম-২-এ সঠিক ঘরে টিক দেওয়া হয়েছে কি না, দুইবার চেক করুন
- ফি পরিশোধের রিসিট স্ক্রিনশট নিয়ে রাখুন
- এনআইডি কার্ডের ফটোকপি ও প্রমাণপত্র সঙ্গে নিন
- গাঢ় রঙের পোশাক পরে যান, টুপি-সানগ্লাস এড়িয়ে চলুন
- মোবাইল নম্বরটি সচল আছে কি না নিশ্চিত করুন
কার্ড হারিয়ে গেলে বা নতুন তুলতে হলে
যাদের এনআইডি কার্ড হারিয়ে গেছে, তাদের জন্য কার্ড হারিয়ে গেলে রি-ইস্যু আবেদনের নিয়ম আলাদাভাবে অনুসরণ করা লাগবে — এখানেই একমাত্র থানায় জিডি করার প্রয়োজন হয়। আর প্রথমবার এনআইডি সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানতে এনআইডি সংশোধনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া দেখতে পারেন। প্রবাসীদের জন্য প্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন, সে বিষয়ে প্রবাসীদের এনআইডি আবেদনের নিয়ম সহায়ক হবে।
এই কাজে মানুষ সবচেয়ে বেশি যেসব ভুল করে

সংশোধনের প্রক্রিয়াটা আসলে খুব জটিল না, কিন্তু কিছু ছোট ভুলের কারণে অনেকের কাজ মাসের পর মাস আটকে থাকে।
তাড়াহুড়ো করে ফরম পূরণ করা সবচেয়ে সাধারণ ভুল। ছবি আর স্বাক্ষর — দুটো পরিবর্তন করতে চাইলেও অনেকে শুধু একটা ঘরে টিক দিয়ে জমা দিয়ে ফেলেন, ফলে অর্ধেক কাজ হয়ে আবার নতুন আবেদন করতে বাধ্য হন।
প্রমাণপত্র ছাড়াই অফিসে যাওয়া আরেকটা বড় সমস্যা। ব্যাংকের কাগজ বা জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র সঙ্গে না থাকলে অফিসার আবেদনই গ্রহণ করেন না, ফলে পুরো একটা কর্মদিবস নষ্ট হয়ে যায়।
এজেন্ট বা দালালের কাছে মূল এনআইডি কার্ড বা কাগজপত্র জমা দিয়ে বসে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ একটা অভ্যাস। মূল কাগজ অন্য কারও হাতে চলে গেলে সেটা হারানো বা অপব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাই নিজে গিয়ে জমা দেওয়াই তুলনামূলক নিরাপদ।
আরেকটা সূক্ষ্ম ভুল — স্ট্যাটাস চেক না করেই মাসের পর মাস অপেক্ষা করা। মাঝে মাঝে টেকনিক্যাল কারণে আবেদন “পেন্ডিং” অবস্থায় আটকে থাকে, আর সেটা নিজে থেকে চেক না করলে কেউ জানায় না।
ভোটার আইডি কার্ডের ছবি ও স্বাক্ষর পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
ছবি পরিবর্তন করতে কি এনআইডি নম্বর বদলে যায়?
না। ছবি বা স্বাক্ষর সংশোধন করলে আপনার এনআইডি নম্বর একই থাকে, শুধু কার্ডের তথ্য আপডেট হয়।
অনলাইনে বসেই কি পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা যায়?
না। ফি পরিশোধ ও ফরম জমা অনলাইনে করা গেলেও নতুন ছবি তোলা ও স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য অফিসে একবার সশরীরে যেতেই হয়।
একই সঙ্গে ঠিকানা বা নামও পরিবর্তন করা যাবে কি?
হ্যাঁ। ফরম-২-তে একাধিক তথ্য একসাথে সংশোধন করার সুযোগ আছে, তবে প্রতিটার জন্য আলাদা প্রমাণপত্র লাগতে পারে।
আবেদন বাতিল হলে ফি কি ফেরত পাওয়া যায়?
সাধারণত সরকারি ফি ফেরতযোগ্য নয়, তাই আবেদনের আগে সব কাগজপত্র ঠিকভাবে যাচাই করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আজ থেকেই যা করবেন
এই পুরো প্রক্রিয়াটা প্রথমে জটিল মনে হলেও, ধাপগুলো একবার বুঝে গেলে আসলে একটা সকালেই সম্পন্ন করা সম্ভব। ফরম পূরণ, ফি পরিশোধ আর কাগজপত্র গোছানো — এই তিনটে জিনিস আগে থেকে ঠিক থাকলে অফিসে গিয়ে বেশি সময় লাগে না।
নিজে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছে — অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব সংশোধন করে ফেলাই ভালো, কারণ ছবি আর স্বাক্ষরের অমিল সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি ঝামেলা তৈরি করে। আপনার কার্ডটা একবার হাতে নিয়ে দেখুন, ছবিটা এখনও আপনার সাথে মিলছে কি না — মিলছে না মনে হলে আজই ফরম-২ ডাউনলোড করে ফেলুন।
সব তথ্য নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ নিয়ম অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে, তবে অফিসভেদে কোনো বিশেষ কাগজ চাইলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তার সাথে একবার সরাসরি কথা বলে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।






