রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রকল্পটি লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর ডিও লেটারের (আধা-সরকারি পত্র) ভিত্তিতে জরুরি পূর্বানুমতি চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চিঠির খবর প্রকাশের পর রংপুরে জনমনে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।
এক নজরে
- প্রকল্প: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় রংপুর বিভাগের ২০০ শয্যার নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র
- প্রস্তাব: রংপুর সদরের বদলে লালমনিরহাট সদরের বড়বাড়ি ইউনিয়নে ১০ একর জমিতে কেন্দ্র স্থাপন
- কারণ হিসেবে চিঠিতে বলা হয়েছে রংপুরে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা
- প্রতিক্রিয়া: বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন পক্ষ প্রকল্পটি রংপুরেই চান
চিঠিতে কী বলা হয়েছে
জাগোনিউজ২৪-এর ১৩ অক্টোবর, মঙ্গলবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জোসেফা ইয়াসমিন চিঠিটিতে সই করেছেন। চিঠি গেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্যের (সিনিয়র সচিব) কাছে।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটে কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন। প্রস্তাবিত জায়গা লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বৈরাগিকুমুর ও নওদাবস মৌজা, মোট ১০ একর।
লালমনিরহাটে কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত হলে প্রকল্প এলাকা বদলে যাবে, তখন ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধন করতে হবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশোধনের সময় বিষয়টি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
রংপুরে জমি নিয়ে কী জটিলতা
অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী, রংপুরের কেন্দ্রটি রংপুর সদর উপজেলার মন্থনা মৌজায় হওয়ার কথা ছিল। বিভিন্ন খতিয়ানে মোট ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
প্রস্তাবিত জমি তিন ফসলি হওয়ায় মালিকরা লিখিতভাবে আপত্তি জানান। চিঠিতে এ কারণেই অধিগ্রহণে জটিলতার কথা বলা হয়েছে।
তবে রংপুর সদরে বিকল্প জমি খোঁজা হয়েছে কি না, চিঠিতে তার উল্লেখ নেই। বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত প্রকল্প কেন অন্য জেলায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়েও কোনো যুক্তি দেওয়া হয়নি।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট
প্রকল্পে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যার নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কথা রয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা, আর প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত।
গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাত বিভাগীয় শহরে কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বাস্তবায়ন করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
সারা দেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে মাত্র চারটি: তেজগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় কেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় আঞ্চলিক কেন্দ্র। রংপুরের মানুষের জন্য সরকারি কোনো সেবা এখন পর্যন্ত ছিল না।
রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষ চিকিৎসাসহ নানা সেবার জন্য বিভাগীয় সদরের ওপর নির্ভর করেন। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, কেন্দ্রটি বিভাগীয় সদর থেকে সরিয়ে লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রংপুরের রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান
রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কথা বলা হলেও তাদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়নি। তাঁর মতে, এ ধরনের সরকারি প্রকল্পের জন্য রংপুরে প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাবে।
রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, সব দিক বিবেচনা করেই রংপুরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, অন্য কোনো জেলা নিজ এলাকায় প্রকল্প চাইলে সেটি আলাদাভাবে করতে পারে।
রংপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বিষয়টিকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না। তাঁর বক্তব্য, রংপুর বিভাগের সদর দপ্তর হওয়ায় কেন্দ্রটি এখানেই হওয়া উচিত, তাই তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
নাগরিক সংগঠন ও অন্যদের বক্তব্য
এনসিপির রংপুর মহানগরের সদস্যসচিব আব্দুল মালেক বলেন, ত্রাণমন্ত্রী স্থানান্তরের আবেদন করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য হলে এর যৌক্তিকতা ও জনস্বার্থ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। তাঁর মতে, এটি রংপুর অঞ্চলের মানুষের সেবা পাওয়ার অধিকার, উন্নয়নের ন্যায্য বণ্টন এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ববোধের প্রশ্ন।
সমাজ পরিবর্তন ও উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি মোস্তফা সাব্বির প্রস্তাবটিকে অযৌক্তিক বলেছেন। তিনি বড়বাড়িকে “পকেট এরিয়া” আখ্যা দিয়ে বলেন, সেখানে কেন্দ্র হলে বিভাগের অন্য জেলা ও উপজেলার মানুষের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু ভৌগোলিক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর হিসাবে রংপুর থেকে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাটের মোগলহাটের দূরত্ব প্রায় সমান। তাই কোনো জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হলে সবার সেবা শতভাগ নিশ্চিত হবে না।
বেঞ্জু আরও বলেন, আগের সরকারের সময় প্রকল্পের বড় অংশ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলে যেত। এখনো মন্ত্রীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রকল্প নিয়ে গেলে সমতা থাকবে না এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্যও পূরণ হবে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বক্তব্য
অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন জানান, প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি অধিগ্রহণের চাহিদাপত্র পাঠিয়ে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছিল। গণবিজ্ঞপ্তিসহ পরবর্তী ব্যবস্থা জেলা প্রশাসনই নেয়।
পরে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসন জানায়, সেখানে কিছু জটিলতা আছে এবং তারা তা সমাধানের চেষ্টা করছে। মাসুদ হোসেন অনানুষ্ঠানিকভাবে জেনেছেন, প্রকল্পটি লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প পরিচালক সম্প্রতি লালমনিরহাটে গিয়ে প্রস্তাবিত জায়গা দেখে এসেছেন, তবে অধিদপ্তর প্রকল্পটি রংপুরে বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছে।
এরপর কী
পরিকল্পনা কমিশন চিঠির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো জানা যায়নি। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ডিপিপি সংশোধন করতে হবে, চিঠিতে এ কথা স্পষ্টভাবেই বলা আছে।
বিষয়টি এখনো চলমান, পরিস্থিতি বদলাতে পারে। নতুন কোনো তথ্য এলে এই প্রতিবেদনে যোগ করা হবে।










