হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে আবার নিবন্ধন করে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া যায়। এসএমএস বা ফোনকলে আসা ছয় সংখ্যার কোড দিলেই অন্য ডিভাইসে লগ ইন থাকা অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগ আউট হয়ে যায়। নিচে ধাপগুলো একে একে দেওয়া হলো।
এক নজরে
- কী করতে হবে: হোয়াটসঅ্যাপে “লগ ইন এগেইন” দিয়ে নিজের নম্বরে আবার নিবন্ধন করুন।
- কী লাগবে: ওই ফোন নম্বরের নিয়ন্ত্রণ এবং এসএমএস বা কলে পাওয়া ছয় সংখ্যার কোড।
- ফলাফল: অন্য সব ডিভাইস থেকে অ্যাকাউন্ট লগ আউট হয়ে যাবে।
এভাবেই হ্যাকাররা অ্যাকাউন্ট দখল করে
ধরুন, পরিচিত একজনের নম্বর থেকে মেসেজ এল, “ভুল করে আমার একটা কোড তোমার নম্বরে চলে গেছে, একটু পাঠিয়ে দাও তো।” আপনি সরল বিশ্বাসে কোডটি পাঠিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পরেই দেখলেন হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আপনি লগ আউট হয়ে গেছেন।
এটা ওটিপি স্ক্যামের চেনা কৌশল। প্রতারকরা সাধারণত ভুয়া অথেনটিকেশন কোড, ওটিপি, অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন কল বা ভুয়া ফিশিং লিংক পাঠিয়ে অন্যের অ্যাকাউন্টে ঢোকার চেষ্টা করে। এ ধরনের সাইবার ক্রাইমে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফাঁদে ফেলাই তাদের প্রধান উপায়।
অ্যাকাউন্ট একবার হাতছাড়া হলে ব্যক্তিগত কথোপকথন ও পরিচিতদের তথ্য ঝুঁকিতে পড়ে। হ্যাকার আপনার পরিচয়ে বন্ধু ও স্বজনদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত বার্তাও পাঠাতে পারে।
হ্যাকড হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার ধাপ
হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট দ্রুত নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- নিজের ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে “লগ ইন এগেইন” অপশনে ট্যাপ করুন।
- “কন্টিনিউ” নির্বাচন করুন।
- দেশের কোডসহ নিজের ফোন নম্বর লিখুন।
- “নেক্সট” ও “ওকে” অপশনে ট্যাপ করুন।
- এসএমএস বা ফোনকলে আসা ছয় সংখ্যার যাচাইকরণ কোড নির্ধারিত ঘরে লিখুন।
নিবন্ধন সম্পন্ন হলেই আপনার অ্যাকাউন্টে লগ ইন থাকা অন্য সব ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগ আউট হয়ে যাবে। এরপর অন্য কেউ নিজের যন্ত্র থেকে আপনার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবে না।
এই কোড কাউকে দেবেন না, পরিচিত বা পরিবারের সদস্যকেও নয়।
টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন পিন চাইলে কী করবেন
নিবন্ধনের সময় হোয়াটসঅ্যাপ দুই ধাপের ভেরিফিকেশন পিন চাইতে পারে। এটি টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন নামেও পরিচিত। পিন আপনার জানা না থাকলে ধরে নিন, অ্যাকাউন্ট দখলকারী নিজেই এই নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করে রেখেছে।
সে ক্ষেত্রে সাত দিন অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করতে হবে। আগে থেকে রিকভারি ই-মেইল যুক্ত থাকলে “ফরগট পিন?” অপশন ব্যবহার করে নতুন পিন তৈরি করা যায়।
তাই এখনই টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন সেটআপ করে রিকভারি ই-মেইল যুক্ত করে রাখুন। হ্যাকিংয়ের পর এটি সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
অ্যাকাউন্ট উদ্ধারে অন্যান্য জরুরি করণীয়
ওপরের পদ্ধতিতে কাজ না হলে বা সন্দেহ থাকলে এই বিকল্পগুলো কাজে লাগাতে পারেন:
- অ্যাপ মুছে আবার লগ ইন: হোয়াটসঅ্যাপ মুছে ফেলে একই নম্বর দিয়ে নতুন করে লগ ইন করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে অ্যাপ নিজেই নম্বর যাচাই করে নেয়।
- সিম সোয়াপের সন্দেহ: মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করুন।
- হোয়াটসঅ্যাপ সাপোর্টে ই-মেইল: সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে সাপোর্টে ই-মেইল করে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করার অনুরোধ জানান।
- অচেনা ডিভাইস মুছুন: অ্যাকাউন্ট ফিরে পেলে “লিংকড ডিভাইসেস” থেকে অচেনা যন্ত্র সরিয়ে দিন।
সাপোর্টে ই-মেইল করবেন যেভাবে
ই-মেইল পাঠাতে হবে [email protected] ঠিকানায়। ই-মেইলের বিষয় বা মূল অংশে এই লাইনটি লিখুন:
Lost/Stolen: Please deactivate my account
এর নিচে আপনার ফোন নম্বর আন্তর্জাতিক ফরম্যাটে দিন। যেমন, বাংলাদেশি নম্বরের ক্ষেত্রে +880 দিয়ে শুরু করে নম্বরটি লিখুন। একই অনুরোধ বারবার পাঠানোর দরকার নেই।
ফিরে পাওয়ার পর পরিচিতদের সতর্ক করুন
বন্ধু, পরিবার ও সহকর্মীদের জানিয়ে দিন যে আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। হ্যাকার আপনার পরিচয়ে তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে টাকা বা কোড চাইতে পারে।
কেউ আপনার নম্বর দিয়ে নতুন করে নিবন্ধনের চেষ্টা করলে অ্যাপ সাধারণত বিজ্ঞপ্তি দেয়। এমন বিজ্ঞপ্তি পেলে যাচাই না করে কাউকে কোড দেবেন না।
অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর মেসেজ পাঠাতে বা পেতে সমস্যা হলে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ না যাওয়ার সমাধান লেখাটি দেখে নিন।
হ্যাকার কি আপনার পুরোনো চ্যাট পড়তে পারে
অন্য কেউ নতুন ডিভাইসে আপনার নম্বর দিয়ে লগ ইন করলেও আগের চ্যাট স্বয়ংক্রিয়ভাবে পড়তে পারে না। হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনে সুরক্ষিত এবং কথোপকথন থাকে আপনার ডিভাইসেই।
গুগল ড্রাইভ বা আইক্লাউডে ব্যাকআপ চালু থাকলে আগের চ্যাট ইতিহাস ফিরিয়ে আনা যায়। তবে কে, কোথা থেকে বা কখন অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল, সে তথ্য হোয়াটসঅ্যাপ সাধারণত দেয় না।
নম্বরের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কী হবে
এই পদ্ধতিতে অ্যাকাউন্ট ফেরত পেতে সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বর বা সিম আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। নম্বরে প্রবেশাধিকার না থাকলে অ্যাকাউন্ট উদ্ধার সম্ভব নাও হতে পারে।
নতুন সিম ব্যবহার করলে হোয়াটসঅ্যাপের “চেঞ্জ নম্বর” সুবিধায় অ্যাকাউন্ট দ্রুত নতুন নম্বরে সরিয়ে নিন। না নিলে পুরোনো নম্বরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর অ্যাকাউন্টে ঢোকার সুযোগ স্থায়ীভাবে হারানোর ঝুঁকি থাকে।
হ্যাকিং ঠেকাতে যে অভ্যাসগুলো গড়ে তুলুন
- হোয়াটসঅ্যাপ সেটিংসে মিডিয়া অটো ডাউনলোড বন্ধ রাখুন।
- অপরিচিতদের পাঠানো ছবি ডাউনলোড করবেন না।
- ওটিপি, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর বা পাসওয়ার্ড হোয়াটসঅ্যাপে কাউকে পাঠাবেন না।
- অচেনা নম্বরের ফোন কল বা সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলুন।
এই অভ্যাসগুলো মেনে চললে সাইবার হামলার ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হলে প্রথমে কী করব?
হোয়াটসঅ্যাপে “লগ ইন এগেইন” দিয়ে নিজের নম্বরে আবার নিবন্ধন করুন। ছয় সংখ্যার কোড দিলেই হ্যাকার সব ডিভাইস থেকে বেরিয়ে যাবে।
সিম হাতে না থাকলে কি অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়া যায়?
ওই নম্বরের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে উদ্ধার সম্ভব নাও হতে পারে। আগে অপারেটরের মাধ্যমে নম্বরটি ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করুন।
পিন মনে না থাকলে কী করব?
রিকভারি ই-মেইল যুক্ত থাকলে “ফরগট পিন?” দিয়ে নতুন পিন বানান। ই-মেইল না থাকলে সাত দিন অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করতে হবে।
হ্যাকার কি আমার আগের মেসেজ পড়ে ফেলেছে?
নতুন ডিভাইসে লগ ইন করলেও সে আপনার আগের চ্যাট স্বয়ংক্রিয়ভাবে পড়তে পারে না। কারণ চ্যাট থাকে আপনার ডিভাইসে এবং বার্তা এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড।
আগের চ্যাট ফেরত আনা যাবে?
গুগল ড্রাইভ বা আইক্লাউডে ব্যাকআপ থাকলে সেখান থেকে চ্যাট ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা যায়।
কে আমার অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল, তা কি জানা যায়?
সাধারণত না। হোয়াটসঅ্যাপ কে, কোথা থেকে বা কখন ঢুকেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয় না।
সিম বদলালে হোয়াটসঅ্যাপে কী করা উচিত?
“চেঞ্জ নম্বর” সুবিধা ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট নতুন নম্বরে সরিয়ে নিন। না করলে পুরোনো নম্বর হারানোর পর অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়ার সুযোগ চিরতরে হারাতে পারেন।








