ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রত্যাহারের কথা থাকলেও ২৯ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবারই শেষ ঘাঁটিগুলো থেকে সেনারা সরে যান। ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন আর জোটের কোনো সেনা নেই।
সংক্ষেপে
- ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান হলো
- ইরান ও তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এটিকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলছে
- ইরানের প্রভাব বাড়া ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পুনরুত্থান নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কিছু ইরাকি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক
- প্রত্যাহার উপলক্ষে ইরাকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে
ইরান ও মিত্র গোষ্ঠীগুলো কী বলছে?
মার্কিন সেনা বিদায় উপলক্ষে ইরাকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি রয়টার্সকে বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁরা ইরাকের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি উদযাপন করবেন। তাঁর ভাষায়, এটি ইরাকিদের জন্য ঐতিহাসিক বিজয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় পরাজয়।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম ২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার প্রত্যাহারকে স্বাগত জানান। তাঁর দাবি, মার্কিন সেনা চলে গেলে ইরাকে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। একই পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসময় অঞ্চলটি ছেড়ে যাবে, কিন্তু ইরান ও তার প্রতিবেশীরা থেকে যাবে।
ইরান বলে আসছে, পশ্চিম এশিয়া থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরানোই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এখন তারা ইরাক থেকে প্রত্যাহারকে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর জয় হিসেবে দেখছে।
ইরানের প্রভাব নিয়ে কী বলছেন বিশ্লেষকেরা?
ইরান-সংশ্লিষ্ট শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেন, জোটের বিদায় কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য সুবিধাজনক। কারণ, বহু বছর ধরে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করা একটি সামরিক শক্তি সরে গেল।
তাঁর মতে, ইরানপন্থি মিলিশিয়ারা এই বিদায়কে নিজেদের আন্দোলনের বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আরও প্রভাব বিস্তারে এই সময়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
ইরাকের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালে জো বাইডেনের আমলে নেওয়া প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তই এখন বাস্তবায়ন করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে।
নিরাপত্তা শূন্যতা ও আইএস নিয়ে কী আশঙ্কা?
মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত বিদায়ের পক্ষে ইরাকিরা, তবে প্রত্যাহারের সময় নিয়ে উদ্বেগ আছে। ফাল্লুজার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জুবাই রয়টার্সকে বলেন, নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব নিতে ইরাক এখনো প্রস্তুত নয়। পূর্ণ সার্বভৌমত্ব নিয়ে কারও দ্বিমত নেই, কিন্তু জোট এভাবে চলে যাওয়ায় একটি শূন্যতা তৈরি হবে বলে সব ইরাকির আশঙ্কা।
এই শূন্যতার সুযোগে ইসলামিক স্টেট আবার সক্রিয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা। প্রায় এক দশক আগে আইএসের ঘোষিত খেলাফত পরাজিত হলেও তাদের সুপ্ত সেল বা ‘স্লিপার সেল’ নেটওয়ার্ক এখনো রয়েছে।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ ও ড্রোন সহায়তা না থাকলে আইএস নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তাঁর দাবি, প্রত্যাহারের খবর প্রকাশের পর গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সুপ্ত সেলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে এবং এতে যোদ্ধাদের মনোবলও বেড়েছে। ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল জোটের প্রত্যাহারের সময় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
২০০৩ থেকে ২০২৬: ইরাকে মার্কিন উপস্থিতির ইতিহাস
সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় মার্কিন জোট। এরপর তারা দেশটি দখল করে, শিয়াদের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে এবং কয়েক বছর বিদ্রোহ দমনে লড়াই করে। ২০১১ সালের শেষ দিকে তারা সেনা প্রত্যাহার করে।
তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ২০১৪ সালে, আইএসের উত্থানের পর মার্কিন বাহিনী ফিরে আসে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুদ্ধে তারা ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা দেয়। ২০১৭ সালে ইরাক আইএসের খেলাফতের সামরিক পরাজয় ঘোষণা করে। আইএস একসময় ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ দখল করেছিল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে আকস্মিক প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া যুদ্ধের তুলনায় ইরাকে প্রায় দ্বিগুণ মার্কিনি নিহত হয়েছেন। রয়টার্সের হিসাবে ইরাকের যুদ্ধে নিহত মার্কিনির সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৫০০।
২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরানের মিত্ররা বারবার মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়, আর কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা করে।
চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে মারা যান। সর্বশেষ একজন সেনা সার্জেন্ট নিহত হন জুলাইয়ে, ইরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটানোর সময়।
সৌদি পাইপলাইন ও ট্রাম্পের মন্তব্য
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা তেহরানের নির্দেশে প্রতিবেশী দেশে হামলা চালাচ্ছে। ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব জানিয়েছে তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলা ইরাকের ভূখণ্ড থেকে হয়েছে। বাগদাদ হামলার নিন্দা জানিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হবে। তাঁর দাবি, ইরান ‘খুব খারাপভাবে ব্যর্থ হচ্ছে’ এবং পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এই মন্তব্যের পর তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখনো চলছে, তাই ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলাতে পারে। নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে খবরটি হালনাগাদ করা হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কবে শেষ হয়েছে?
নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগে, মঙ্গলবার শেষ ঘাঁটিগুলো থেকে সেনা সরে যায়।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সেনা কেন গিয়েছিল?
একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ২০০৩ সালে মার্কিন কোয়ালিশন বাহিনী ইরাকে হামলা চালায়।
ইরাকে যুদ্ধে কত মার্কিনি নিহত হয়েছেন?
রয়টার্সের হিসাবে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিনি।
মার্কিন সেনা চলে যাওয়ায় কী আশঙ্কা করা হচ্ছে?
ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা ইরানের প্রভাব বাড়া এবং নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগে আইএসের পুনরুত্থানের আশঙ্কা করছেন।










