আয় করযোগ্য না হলেও ই-টিন থাকলে রিটার্ন দিতে হতে পারে। তবে রিটার্ন না দিলেই সবার জরিমানা হয় না, আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করেন উপকর কমিশনার এবং তা নির্ভর করে করদাতার পরিস্থিতির ওপর। রিটার্ন বাধ্যতামূলক কি না, তা যাচাইয়ের দায়িত্ব করদাতার নিজের।
এক নজরে
- ই-টিন থাকা মানেই রিটার্ন বাধ্যতামূলক নয়, আবার আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেই অব্যাহতিও নয়
- সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা বছরে ৪ লাখ টাকা
- রিটার্ন বাধ্যতামূলক হলে আয় করযোগ্য না হলেও জিরো রিটার্ন দেওয়া যায়
ফেসবুক মনিটাইজেশন আর ই-টিন নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের যত ভয়
কয়েক দিন ধরে ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে প্রচার চলছে, ই-টিন থাকলে এবং রিটার্ন না দিলে সবাইকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সেই ক্রিয়েটররা, যাঁরা পেজে মনিটাইজেশন পাওয়ার পর টিন সার্টিফিকেট জমা দিতে হয় বলে তাড়াহুড়ো করে অনলাইনে ই-টিন খুলেছেন।
অনেকে আবার ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যাংকঋণের প্রয়োজনে টিন নিয়েছেন। রিটার্ন নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না বলেই এখন ভয়টা বেশি।
আয় করযোগ্য না হলেও কি রিটার্ন দিতে হয়
নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে হয়। এনবিআরের নিয়মে ই-টিন আর আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও এই শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন আবশ্যক:
- সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনে নির্দিষ্ট করা পেশাজীবী, যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী (বার কাউন্সিলের সদস্য), চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও বিভিন্ন পেশাদার সংগঠনের সদস্য
- যাঁর বার্ষিক মোট আয় সরকারের নির্ধারিত করমুক্ত সীমার বেশি
- যাঁকে ব্যাংকঋণ, জমি বা সম্পত্তি রেজিস্ট্রি কিংবা অন্য কোনো সেবা নেওয়ার সময় রিটার্ন জমার স্লিপ দেখাতে হয়
- যিনি মোটরযান রেজিস্ট্রেশন বা নবায়ন করছেন
- অংশীদার, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক কিংবা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী
এর কোনোটিই আপনার ক্ষেত্রে না খাটলে রিটার্ন বাধ্যতামূলক কি না, তা নিশ্চিত হতে কর সার্কেলে যোগাযোগ করুন।
রিটার্ন না দিলে জরিমানা হবে কি: আয়কর আইন ২০২৩-এর নিয়ম
আয়কর আইন ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দিলে উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন। ক্ষমতা আছে, কিন্তু সবার ওপর একই অঙ্কের জরিমানা আপনাআপনি বসে না।
| করদাতার ধরন | জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা |
|---|---|
| আগে কখনো আয় নিরূপণ (অ্যাসেসমেন্ট) হয়নি | ৫ হাজার টাকা |
| আগে আয় নিরূপণ হয়েছে | সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের প্রদেয় করের ৫০% অথবা ১ হাজার টাকা, যেটি বেশি |
সর্বনিম্ন জরিমানা ১ হাজার টাকা। দেরি চলতে থাকলে প্রতিদিনের জন্য আরও ৫০ টাকা যোগ হয়।
ধরুন, মনিটাইজেশনের জন্য এ বছরই ই-টিন নিয়েছেন এবং আগে কখনো আপনার আয় নিরূপণ হয়নি। দেরিতে রিটার্ন দিলে আপনার ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা, এর বেশি নয়।
নিয়ম না জানলে দায় কার
রিটার্ন বাধ্যতামূলক কি না, তা প্রথমে যাচাইয়ের দায়িত্ব করদাতার নিজের। এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী নিজের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা জেনে নেওয়ার কথাই বলা হচ্ছে। ফেসবুকের গুজবে বিশ্বাস না করে নিজের রিটার্ন স্ট্যাটাস নিজে দেখে নেওয়াই এখানে সবচেয়ে কাজের পরামর্শ।
জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্ত নেন উপকর কমিশনার, আর ফেসবুকে ছড়ানো পোস্ট নয়, আইনই চূড়ান্ত। নিয়ম না জানাকে ছাড়ের কারণ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত হতে কর সার্কেলে যোগাযোগ করা নিরাপদ।
রিটার্ন জমার শেষ সময় কবে
আইন অনুযায়ী ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন জমার শেষ দিন প্রতি বছর ৩০ নভেম্বর। গত বছর (২০২৫-২৬ করবর্ষ) এনবিআর কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত করেছিল।
সময় বাড়ানো হলে এনবিআর আলাদা আদেশ জারি করে, তাই চূড়ান্ত তারিখ নিশ্চিত করতে সংস্থার ঘোষণা দেখে নেওয়া ভালো। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও জরিমানা দিয়ে রিটার্ন জমার সুযোগ থাকে। রিটার্ন না দিলে সরকার অনুমোদিত কর রেয়াতের সুবিধাও হাতছাড়া হয়।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের করণীয়
প্রথমে দেখুন, উপরের তালিকার কোনো শর্ত আপনার ওপর খাটে কি না। খাটলে আয় যত কমই হোক, রিটার্ন দিতে হবে।
ফেসবুক বা অন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে আসা আয়ে কর কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা প্রতিটি ক্ষেত্রের তথ্যের ওপর নির্ভর করে। আয়ের উৎস নিয়ে নিশ্চিত না হলে অভিজ্ঞ কর আইনজীবী বা কর সার্কেলের পরামর্শ নিন।
জিরো রিটার্ন কী এবং কীভাবে দেবেন
রিটার্ন বাধ্যতামূলক হলে এবং আয় করমুক্ত সীমার (বছরে ৪ লাখ টাকা) নিচে থাকলে যে রিটার্নে কর দিতে হয় না, সেটিই জিরো রিটার্ন। এতে জরিমানা ও আইনি ঝামেলা এড়ানো যায়।
একটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। ফরমে প্রকৃত আয়, ব্যয় এবং সম্পদ ও দায়ের বিবরণী ঠিকঠাক লিখতে হবে। মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা আয় হলে আয়ের ঘরে সেই অঙ্কই বসবে, শূন্য থাকবে কেবল করের ঘরে। আয় নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন ও স্ট্যাটাস যাচাই
এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd-এ লগইন করে অতীতের কোনো করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়েছে কি না এবং প্রাপ্তিস্বীকারপত্র আছে কি না, তা দেখা যায়।
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের নিয়ম
ভবিষ্যতে আর কখনো টিআইএন বা রিটার্নের প্রয়োজন না হলে শর্ত সাপেক্ষে টিআইএন বাতিলের আবেদন করা যায়। বাতিল হবে কি না, তা কর কর্তৃপক্ষের যাচাই ও অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে। টিআইএন বাতিল আর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দুটি আলাদা বিষয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আয় করযোগ্য না হলে কি রিটার্ন দিতে হবে?
সবার ক্ষেত্রে নয়। উপরের তালিকার কোনো শর্ত খাটলে আয় করযোগ্য না হলেও রিটার্ন আবশ্যক।
রিটার্ন না দিলে কি সবার জরিমানা হবে?
না। জরিমানা আরোপ করেন উপকর কমিশনার, আর যাঁর আগে আয় নিরূপণ হয়নি, তাঁর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা।
জিরো রিটার্ন কী?
আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকায় যে রিটার্নে কর দিতে হয় না। ফরমে আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য সঠিকভাবে লিখতে হয়।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!










