দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্যে পাঁচটি রেলপথ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। ২৬ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় প্রকল্পগুলো একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এক নজরে
- পথের দূরত্ব ১,০৭৭ কিলোমিটার
- উত্তরাঞ্চলের ট্রেনের ঘুরপথ ১১২ কিলোমিটার কমার কথা
- যাত্রায় সাশ্রয় তিন থেকে চার ঘণ্টা
- পাঁচ প্রকল্পের সমন্বয়ে নতুন ২০টি সরাসরি আন্তঃনগরসহ প্রায় আড়াইশ ট্রেন চালানোর সুযোগ
পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের ৫টি অগ্রাধিকার প্রকল্প
পশ্চিমাঞ্চলে অগ্রাধিকার পেয়েছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক। পূর্বাঞ্চলে আছে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়ন। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ প্রকল্পের সমন্বয়ে ১,০৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে ট্রেন চালানো যাবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই কাজ শেষ করে ট্রেন চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
| প্রকল্প | অঞ্চল | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন (ডুয়েলগেজ) | পশ্চিমাঞ্চল | ৯০১ একর জমি অধিগ্রহণ শেষ; সংশোধিত ডিপিপি একনেকের অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে |
| শান্তাহার-বগুড়া লিংক | পশ্চিমাঞ্চল | অগ্রাধিকার প্রকল্প; আলাদা অগ্রগতির বিবরণ জানা যায়নি |
| চট্টগ্রাম-দোহাজারী (মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজ) | পূর্বাঞ্চল | প্রকল্প অনুমোদিত; ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগ শেষ, মূল কাজের প্রস্তুতি চলছে |
| টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া | পূর্বাঞ্চল | ডিপিপি অনুমোদনের উদ্যোগ চলছে |
| লাকসাম-চট্টগ্রাম | পূর্বাঞ্চল | ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে |
উত্তরাঞ্চলের ট্রেনের ঘুরপথ কমবে ১১২ কিলোমিটার
পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ট্রেন এখন ঢাকায় যেতে ঈশ্বরদী হয়ে ঘুরপথে চলে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের মতে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক হলে এই পথ প্রায় ১১২ কিলোমিটার ছোট হবে।
পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলাহাটির ট্রেন তিন থেকে চার ঘণ্টা কম সময়ে ঢাকা পৌঁছাতে পারবে। সচিব বলেন, এতে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে এবং রাজধানীসহ সারাদেশে কম খরচে দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ লাইন: জমি মিলেছে, অনুমোদনের অপেক্ষা
এই প্রকল্প সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণ করা ৯০১ একর জমি রেলওয়েকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এখন অপেক্ষা একনেকের অনুমোদনের।
শান্তাহার-বগুড়া লিংক যুক্ত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ব্রডগেজ রেল যোগাযোগ কার্যকর হবে। একই সংযোগ দিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলার পথও তৈরি হবে।
পূর্বাঞ্চলে ডুয়েলগেজ রূপান্তর: কক্সবাজার পর্যন্ত সংযোগের ভিত্তি
পশ্চিমের ব্রডগেজ লাইনকে কক্সবাজারের সঙ্গে জুড়তে পূর্বাঞ্চলের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ লাইনকেও ডুয়েলগেজে আনতে হচ্ছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ আগেই ডুয়েলগেজ হয়েছে। আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্পও শেষ। বাকি অংশ ডুয়েলগেজ হলে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেনের অবকাঠামো শক্ত হবে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী প্রকল্পে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনা হবে। সচিব জানান, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজশাহী, চিলাহাটি ও অন্য ব্রডগেজ রুট থেকেও কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানো যাবে।
ভ্রমণের সময় কমাবে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্প
পঞ্চগড়-কক্সবাজার পথের পাশাপাশি ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইনও অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইন কুমিল্লাকে সরাসরি ঢাকার শ্যামপুরের সঙ্গে যুক্ত করবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব কমবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার, আর যাত্রার সময় কমবে দুই ঘণ্টা।
প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত। খসড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুমোদিত হয়েছে, চূড়ান্ত সমীক্ষার অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন। পুরো লাইন উড়ালপথে করার পরিকল্পনা থাকায় ভূমি অধিগ্রহণ কম লাগবে এবং লেভেল ক্রসিং সীমিত থাকবে। চলতি অর্থবছরে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের ডিপিপি অনুমোদনের লক্ষ্য আছে।
এর বাইরে লালমনিরহাট-বগুড়া এবং পার্বতীপুর-কাউনিয়া-রংপুর রুটকে ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। রেলওয়ের পরিকল্পনা হলো আগে প্রধান রেলপথ আধুনিক করা, তারপর ধাপে ধাপে শাখা লাইনগুলো মূল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা।
২৬ অক্টোবর থেকেই কক্সবাজার যাচ্ছে মহানগর এক্সপ্রেস
সরাসরি ট্রেনের লক্ষ্যের দিকে একটি ছোট পদক্ষেপ আজই দেখা যাচ্ছে। ২৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর এক্সপ্রেস কক্সবাজার পর্যন্ত চলবে। নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীর যাত্রীরা ট্রেন না বদলেই কক্সবাজার যেতে পারবেন।
ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এই প্রস্তাব রেলভবনে পাঠিয়েছিল ১৭ আগস্ট। পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান জানান, ট্রেনটি কক্সবাজার এক্সপ্রেস বা পর্যটক এক্সপ্রেসের মতো বিরতিহীন চলবে না। পথে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে থামবে।
নতুন কোচ ও লোকোমোটিভে বাড়ছে রেলের সক্ষমতা
নতুন রুট তৈরির পাশাপাশি রেলের গাড়ির সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে, কারণ সরাসরি ট্রেন চালাতে পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ ও কোচ লাগবে। রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার প্রকল্পের প্রথম চালানে ১৮টি কোচ দেশে এসেছে। এর ১২টি দিয়ে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকা-পাবনা-ঢাকা রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা-খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি আন্তঃনগরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। গত ১০ আগস্ট ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন উদ্বোধন হয়েছে।
কেনাকাটার পরিকল্পনা:
- এআইআইবির অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে
- এডিবির অর্থায়নে ২০০টি মিটারগেজ কোচ, তিনটি রিলিফ ক্রেন ও আন্ডার-ফ্লোর হুইল লেদ মেশিনের ডিপিপি প্রণয়ন শেষ
- ৭০টি লোকোমোটিভ (৩০টি মিটারগেজ, ৪০টি ব্রডগেজ) ও তিন বছরের সার্ভিস কন্ট্রাক্টের প্রক্রিয়া শুরু
- আগামী অর্থবছরে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ও ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ কেনার পরিকল্পনা
নতুন প্রযুক্তির আন্ডার-ফ্লোর হুইল লেদ চালু হলে চাকা খুলে না ফেলেই রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে। এতে সময় কমবে এবং কর্মদক্ষতা বাড়বে।
রেল রক্ষণাবেক্ষণ, লেভেল ক্রসিং নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা
লম্বা পথে ট্রেন চালাতে লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাও জরুরি। গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৮ লাখ ৬১ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। বিভিন্ন প্যাকেজে টেন্ডার চলছে। অকেজো ২০ সেট ডেমু ট্রেন পিপিপির মাধ্যমে পুনর্বাসনের উদ্যোগও আছে।
ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনের লেভেল ক্রসিং আন্ডারপাস বা ওভারপাসে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ হয়েছে। ঢাকা-টঙ্গী অংশের তিনটি লেভেল ক্রসিংয়ে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বসানোর উদ্যোগে বুয়েটকে যুক্ত করা হয়েছে। সফল হলে ধাপে ধাপে সারাদেশে এটি চালুর পরিকল্পনা আছে।
যাত্রীসেবায় কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার স্টেশনে বিটিসিএলের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে। পর্যটক, কক্সবাজার, বনলতা ও উপবন এক্সপ্রেসে স্টারলিংকের ওয়াই-ফাই মিলছে। কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন বেসরকারি খাতে চালাতে পুনঃদরপত্র আহ্বানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
উত্তরের পাহাড় থেকে দক্ষিণের সমুদ্র: সরাসরি ট্রেনের পথে কী বাকি
পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে কোনোটি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়, কোনোটি মূল কাজের প্রস্তুতিতে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জের ডিপিপি একনেকের দরজায়, লাকসাম-চট্টগ্রাম ও টঙ্গী-আখাউড়া অংশের অনুমোদনও বাকি। সরাসরি ট্রেন ঠিক কবে চলবে, তার নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষিত হয়নি, ফলে প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সময়সূচিও বদলাতে পারে।
সবগুলো প্রকল্প শেষ হলে হিমালয়ঘেঁষা পঞ্চগড় থেকে বঙ্গোপসাগরের কূলে কক্সবাজারের ১,০৭৭ কিলোমিটার পথ একটানা ট্রেনে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন একই নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পঞ্চগড়-কক্সবাজার সরাসরি ট্রেনের জন্য কোন কোন প্রকল্প জরুরি?
পশ্চিমে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক। পূর্বে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম। এর সঙ্গে ডুয়েলগেজ রূপান্তরের কাজ জড়িত।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন এখন কোন ধাপে?
জমি অধিগ্রহণ শেষ। সংশোধিত ডিপিপি একনেকের অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাত্রায় কী বদল আসবে?
দূরত্ব কমবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার এবং সময় কমবে দুই ঘণ্টা।










