নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে কবরের দুই ফেরেশতার প্রশ্ন নিয়ে প্রচলিত ইসলামি বিশ্বাসের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেওয়া ইসলামি বক্তা ইয়াহায়া মাসুসুকাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যায় কাতসিনা রাজ্যের দুতসিন মা শহরে নিজের বাড়ির সামনে হামলার শিকার হন ৪৭ বছর বয়সী এই বক্তা; তাঁর সঙ্গে থাকা এক অতিথিও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বুধবার, ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
এক নজরে ইয়াহায়া মাসুসুকা হত্যা
- নিহত ব্যক্তি: ইয়াহায়া মাসুসুকা
- বয়স: ৪৭ বছর
- পেশা: ইসলামি বক্তা
- ঘটনার তারিখ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার
- ঘটনাস্থল: দুতসিন মা শহর, কাতসিনা রাজ্য, নাইজেরিয়া
- হামলার ধরন: মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তির গুলিবর্ষণ
- হত্যার কারণ: এখনো নিশ্চিত নয়
নাইজেরিয়ায় ইসলামি বক্তা হত্যা: যেভাবে হামলার শিকার হন মাসুসুকা
সোমবার সন্ধ্যায় নিজের বাড়ির সামনে অতিথিদের বিদায় জানাচ্ছিলেন মাসুসুকা। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
হামলায় তাঁর এক অতিথিও গুলিবিদ্ধ হন। পরে দুজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হামলাকারীদের পরিচয়, হত্যার উদ্দেশ্য কিংবা তাঁদের সঙ্গে নিহত বক্তার কোনো পূর্ববিরোধ ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাসুসুকাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
কবরের দুই ফেরেশতা নিয়ে কী বলতেন ইয়াহায়া মাসুসুকা
মাসুসুকা মূলত পবিত্র কোরআনের ভিত্তিতে ধর্মীয় বক্তব্য দিতেন। হাদিসের কিছু বর্ণনা এবং ইসলামের প্রচলিত কয়েকটি বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে তিনি ধর্মীয় অঙ্গনে বিতর্কের মুখে পড়েন।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর কবরে দুই ফেরেশতা এসে মৃত ব্যক্তিকে তাঁর রব, ধর্ম ও নবী সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। মাসুসুকা এই প্রচলিত বিশ্বাস গ্রহণ করতেন না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত। নিজের বাড়িতে স্টুডিও স্থাপন করে তিনি আলোচনা রেকর্ড করতেন এবং সেগুলো অনলাইনে প্রকাশ করতেন।
ধর্মীয় মতবিরোধে আগেও কারাগারে ছিলেন তিনি
হাদিস ও অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে তাঁর অবস্থানকে কেন্দ্র করে আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সম্মানিত ইসলামি পণ্ডিতদের বিশ্বাস নিয়ে উপহাস করার অভিযোগে তাঁকে নয় মাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল।
১৩ বছর বয়সে একটি কোরআনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন মাসুসুকা। পরে তিনি মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ওমানে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
পরবর্তী সময়ে নিজের বাড়িতে স্টুডিও স্থাপন করে ধর্মীয় বক্তব্য রেকর্ড করার ব্যবস্থা করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ায় তাঁর ধর্মীয় ব্যাখ্যা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
উগ্রবাদের বিরোধিতা ও আন্তধর্মীয় সংলাপে ভূমিকা
ধর্মীয় মতামত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মাসুসুকা সহিংস উগ্রবাদ ও মৌলবাদের বিরোধিতা করতেন। নাইজেরিয়ায় মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার জন্যও পরিচিত ছিলেন তিনি।
এই ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে নেটওয়ার্ক ফর গুড গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি তাঁকে ‘পিস অ্যাম্বাসেডর অ্যাওয়ার্ড’ দেয়। তাঁর ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ভূমিকা—দুটি দিকই তাঁর পরিচয়ের অংশ ছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই স্ত্রী ও সাত সন্তানের জনক ছিলেন মাসুসুকা। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য অনুসরণকারী মানুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য থেকে বোঝা যায়; তবে তাঁদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
উত্তর নাইজেরিয়ায় ধর্মীয় বক্তাদের হত্যার পটভূমি
গত দুই দশকে নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে বেশ কয়েকজন পরিচিত মুসলিম ধর্মীয় বক্তা নিহত হয়েছেন। এ অঞ্চলে ধর্মীয় বক্তাদের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী বোকো হারামের সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে।
২০০৯ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করা বোকো হারাম পশ্চিমা সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং নাইজেরিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থার বিরোধিতা করে। গোষ্ঠীটি একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অনুসরণ করে এবং নিজেদের মতাদর্শ ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকারী কয়েকজন ধর্মীয় বক্তাকে অতীতে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
তবে মাসুসুকার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বোকো হারামের যোগসূত্র রয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের মিল থাকলেও তদন্তের তথ্য ছাড়া কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করা ঠিক হবে না।
নাইজেরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতা চলছে। গত ২৫ বছরে দেশটিতে হাজারো মুসলিম ও খ্রিষ্টান নিহত হয়েছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়াহায়া মাসুসুকা হত্যার কারণ এখনো অজানা
মাসুসুকাকে হত্যার পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া হুমকির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য নেই।
তাঁর ধর্মীয় বক্তব্য, অতীতের কারাবাস এবং উত্তর নাইজেরিয়ায় ধর্মীয় বক্তাদের ওপর হামলার ইতিহাস ঘটনাটিকে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে। তবে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্ভরযোগ্য তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত তথ্য প্রয়োজন।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ অক্টোবর ২০২৬।









