নয় বছরের একটা ছেলের বানানো শব্দ আজ কোটি মানুষের মুখে
গুগল নামটা প্রথমে কোনো কোম্পানির জন্য রাখাই হয়নি। এক নয় বছরের ছেলে একটা বিশাল সংখ্যার জন্য শব্দটা বানিয়েছিল, নিছক মজা করে।
বিশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকান গণিতবিদ এডওয়ার্ড ক্যাসনার তাঁর ভাগ্নে মিল্টন সিরোত্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ১-এর পরে ১০০টা শূন্য বসালে যে সংখ্যা হয়, তার নাম কী হতে পারে। ছেলেটি বলল “গুগোল” (Googol)।
কয়েক দশক পরে স্ট্যানফোর্ডের দুই গবেষক সেই শব্দটাই বেছে নিলেন তাঁদের সার্চ ইঞ্জিনের জন্য। বানানটা একটু বদলে গেল, আর শব্দটা হয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত ব্র্যান্ডগুলোর একটা।
সংক্ষেপে উত্তর: গুগল শব্দের আলাদা কোনো আক্ষরিক বাংলা অর্থ নেই, কারণ এটি একটি কোম্পানির নাম। নামটি এসেছে গুগোল (Googol) নামের গাণিতিক সংখ্যা থেকে, যার মানে ১-এর পরে ১০০টি শূন্য। প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সার্গেই ব্রিন নামটি বেছেছিলেন বিশাল পরিমাণ তথ্যের ধারণা বোঝাতে। ক্রিয়া হিসেবে “গুগল করা” মানে ইন্টারনেটে খোঁজা।
১০১ অঙ্কের একটা সংখ্যা, যা একটা সার্চ ইঞ্জিনের স্বপ্ন হয়ে গেল
গুগোল সংখ্যাটা লিখতে লাগে মাত্র ১০১টা অঙ্ক, কিন্তু এর মান কল্পনার বাইরে। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে পরমাণুর সংখ্যা অনুমান করা হয় ১০-এর ঘাত ৮০-র কাছাকাছি। গুগোল তার চেয়েও কোটি কোটি গুণ বড়।
অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রতিটা পরমাণুকে একটা করে জিনিস ধরে গুনলেও গুগোলের নাগাল পাওয়া যাবে না। পেজ আর ব্রিনের লক্ষ্য ছিল ঠিক এমন এক অতিকায় তথ্যভান্ডারকে গুছিয়ে সাজানো। তাঁদের কাছে নামটা ছিল একটা প্রতিজ্ঞার মতো: ওয়েব যত বড়ই হোক, আমরা সেটাকে খুঁজে পাওয়ার উপযোগী করব।
ক্যাসনার নিজে আরেক ধাপ এগিয়ে “গুগোলপ্লেক্স” নামও দিয়েছিলেন। এর মানে ১-এর পরে গুগোল সংখ্যক শূন্য। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সব জায়গা কাগজ ধরলেও সংখ্যাটা পুরো লিখে ফেলা যাবে না।
গুগল এর বাংলা অর্থ কি?
বাংলায় “গুগল” একটি নামবাচক বিশেষ্য, যার আলাদা কোনো অভিধান-অর্থ নেই। তবে প্রয়োগে শব্দটার তিনটা রূপ পাওয়া যায়।
- নাম হিসেবে: গুগল কোম্পানি বা এর সার্চ ইঞ্জিন।
- ক্রিয়া হিসেবে: “গুগল করা” মানে ইন্টারনেটে কোনো তথ্য বা মানুষের খোঁজ নেওয়া। মেরিয়াম-ওয়েবস্টারের অভিধানে শব্দটি ক্রিয়া হিসেবেও তালিকাভুক্ত।
- উৎস হিসেবে: গুগোল, মানে ১০-এর ঘাত ১০০।
বাংলায় লেখার সময় একটা ছোট কৌশল কাজে লাগে। কোম্পানির জন্য “গুগল” আর সংখ্যাটার জন্য “গুগোল” লিখলে দুটোকে আলাদা করে চেনা যায়, কারণ ইংরেজিতে দুটোর বানান Google আর Googol। বাংলা ভাষায় “গুগল করা” একটা যৌগিক ক্রিয়ার মতো বসে গেছে, যেমন “ফোন করা” বা “মেসেজ করা”।
ব্যাকরাব থেকে গুগল: নামটা কেন বদলাতে হলো?
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রকল্পের প্রথম নাম ছিল “ব্যাকরাব” (BackRub)। নামটা এসেছিল এর কাজের ধরন থেকে, কারণ সিস্টেমটা ওয়েবসাইটগুলোর “ব্যাকলিংক” বিশ্লেষণ করত।
ব্যাকরাব নামটা শুনতে অদ্ভুত ছিল, আর কাজের পরিধিও এর চেয়ে অনেক বড় হয়ে যাচ্ছিল। তাঁরা পেজর্যাঙ্ক (PageRank) নামের একটা পদ্ধতি বানিয়েছিলেন, যা লিংকের গুরুত্ব দেখে পাতাগুলোকে সাজাত। এই পদ্ধতিতে কোটি কোটি পাতা ঘাঁটা সম্ভব ছিল। তাই নামটাও এমন চাই, যা এই বিশালতা বোঝায়।
স্ট্যানফোর্ডে প্রকাশিত মূল গবেষণাপত্রে তাঁরা নিজেরাই বলেছেন, Google হলো গুগোলের একটা প্রচলিত বানান এবং বিশাল পরিসরের সার্চ ইঞ্জিন বানানোর লক্ষ্যের সাথে নামটা মানানসই। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার সাজানোর যে স্বপ্ন তাঁদের ছিল, সেটাকে এক শব্দে ধরার জন্য গুগোলের চেয়ে ভালো কিছু ছিল না।
শন অ্যান্ডারসন আর বানান-ভুলের গল্প
নামকরণের গল্পে তৃতীয় একজন মানুষও আছেন, স্ট্যানফোর্ডের আরেক শিক্ষার্থী শন অ্যান্ডারসন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী নতুন নাম নিয়ে আলোচনার সময় তিনি ও ল্যারি পেজ কয়েকটা শব্দ নিয়ে ভাবছিলেন, আর শব্দ বাছাইয়ের এক পর্যায়ে “গুগোল” উঠে আসে।
ডোমেইন নাম খালি আছে কি না, সেটা যাচাই করতে গিয়ে অ্যান্ডারসন নাকি googol.com-এর জায়গায় google.com টাইপ করে ফেলেন। বানানটা পেজের পছন্দ হয়ে যায়, আর সেই বানানেই ডোমেইনটা রেজিস্টার হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে, সেপ্টেম্বর মাসে, কোম্পানিটা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
গল্পের খুঁটিনাটি বিভিন্ন সূত্রে একটু আলাদা পাওয়া যায়। এই বিষয়ে কয়েকটা সূত্র ঘেঁটে দেখার পর আমি এটাকে “সবচেয়ে প্রচলিত বর্ণনা” হিসেবেই নিচ্ছি, চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়। আমি নিজে অবশ্য এই বানান-ভুলের ঘটনাটা জানার পরই বুঝেছিলাম, কেন গুগল আর গুগোল ইংরেজিতে আলাদা বানানে লেখা হয়।
নামকরণের পুরো ঘটনাটা ভিডিওতে দেখে নিন, গুগোল সংখ্যা আর ডোমেইনের বানান-ভুলের গল্পটা দুই মিনিটেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
গুগল কোম্পানির নাম কি, মালিক কে?
কোম্পানির আইনি নাম Google LLC, আর এর মূল প্রতিষ্ঠান Alphabet Inc. প্রধান কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ শহরে।
পরে গুগলের নানা প্রকল্পকে আলাদা করে সামলানোর জন্য অ্যালফাবেট গঠন করা হয়। এখন গুগল সেই অ্যালফাবেটের সবচেয়ে পরিচিত অংশ। অ্যালফাবেট শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত, তাই মালিকানা বহু শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে ভাগ করা। পেজ ও ব্রিন বড় শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে আছেন। কোম্পানির নিজের ভাষায় পরিচয় পেতে গুগলের অফিসিয়াল পরিচিতি পাতা দেখতে পারেন।
কম-জানা তথ্য ও ভুল ধারণা
“গুগল করা” নিয়ে খোদ গুগলের দুশ্চিন্তা
এত জনপ্রিয় হওয়াটা গুগলের জন্য একটা ঝুঁকিও ছিল। ট্রেডমার্ক আইনে একটা ব্র্যান্ডনাম যদি সবাই সাধারণ শব্দ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন সেই নামের ওপর কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ার নাম “জেনেরিসাইড” (Genericide)।
এর উদাহরণ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে “অ্যাসপিরিন” নামটা এক সময় ব্রান্ডের হাতছাড়া হয়ে সাধারণ ওষুধের নামে পরিণত হয়েছিল। আর জেরক্স কোম্পানি বহুদিন ধরে বিজ্ঞাপনে অনুরোধ করেছে, মানুষ যেন যেকোনো ফটোকপিকে “জেরক্স করা” না বলে।
গুগলও নিজের নাম ট্রেডমার্ক হিসেবে সুরক্ষিত রাখতে সতর্ক থেকেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের একটি আপিল আদালতে প্রশ্ন উঠেছিল যে গুগল কি সাধারণ ক্রিয়ায় পরিণত হয়ে গেছে। আদালত রায় দিয়েছে, শব্দটা ক্রিয়া হিসেবে চালু থাকলেও সেটা ট্রেডমার্ক বাতিলের কারণ নয়।
গুগলি: ক্রিকেটে আরেক “গুগল”
ক্রিকেটে “গুগলি” হলো লেগ-স্পিনারের এমন একটা বল, যা ডান হাতি ব্যাটসম্যানের কাছে উল্টো দিকে ঘুরে আসে। ইংরেজ ক্রিকেটার বার্নার্ড বোসাঙ্কেটকে এই বলের উদ্ভাবক ধরা হয়। শব্দটার উৎস নিয়ে অবশ্য নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন, আর কোম্পানির নামের সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
মিথ বনাম বাস্তবতা
| প্রচলিত ধারণা | বাস্তবতা |
|---|---|
| Google মানে “Global Organization of Oriented Group Language of Earth” | প্রতিষ্ঠাতাদের লেখায় এমন কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। নামটা এসেছে গুগোল সংখ্যার বানান থেকে |
| ব্যাকরাব আর গুগল দুটো আলাদা প্রকল্প | একই প্রকল্পের প্রথম নাম ছিল ব্যাকরাব, পরে সেটাই গুগল হয় |
| গুগল আর অ্যালফাবেট একই জিনিস | গুগল অ্যালফাবেটের সবচেয়ে পরিচিত অংশ, আর অ্যালফাবেট মূল প্রতিষ্ঠান |
| “গুগল করা” বলাটা কোম্পানির নিজেরই চাওয়া | ট্রেডমার্ক হারানোর ভয়ে গুগল সতর্ক থেকেছে |
| গুগল আর গুগোল একই বানান | কোম্পানির বানান Google, সংখ্যাটার বানান Googol |
গুগল নিয়ে আপনাদের প্রশ্ন আমাদের উত্তর
গুগল শব্দের মানে কি?
গুগল একটি কোম্পানির নাম, তাই এর আক্ষরিক বাংলা মানে নেই। প্রয়োগে “গুগল করা” মানে ইন্টারনেটে খোঁজা।
Google এর পূর্ণরূপ কি?
Google এর অফিসিয়াল পূর্ণরূপ নেই। নামটি একটি সংখ্যার বানান-রূপ, কোনো শব্দ-সংক্ষেপ নয়।
গুগল কোন দেশের কোম্পানি?
গুগল যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি। প্রধান কার্যালয় ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে।
Google Translate এর বাংলা অর্থ কি?
Google Translate এর বাংলা অর্থ “গুগল অনুবাদ”, মানে গুগলের অনুবাদ সেবা। এতে ইংরেজি শব্দ বসিয়ে ভাষা বাংলা করে দিলে সঙ্গে সঙ্গে অর্থ দেখা যায়।
Goggle আর Google কি একই?
না, Goggle মানে সুরক্ষা চশমা, যেমন সাঁতারের বা মোটরসাইকেলের চশমা। ক্রিয়া হিসেবে goggle মানে চোখ বড় বড় করে তাকানো। অনেকে সার্চের সময় বানান ভুল করে Google-এর জায়গায় goggle লেখেন।
শেষ কথা: একটা শিশুর শব্দ থেকে কোটি মানুষের শব্দভান্ডারে
একটা গণিতের শব্দ, একটা ডোমেইনের বানান-ভুল আর দুই গবেষকের স্বপ্ন মিলেই আজকের গুগল নামটা তৈরি হয়েছে। এই লেখা তৈরির সময় যতগুলো সূত্র দেখেছি, সবখানেই একটা জিনিস চোখে পড়েছে: নামটা ছোট, কিন্তু এর পেছনের ভাবনা বিশাল।
আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে এটা ভাবতে যে ক্যাসনারের ভাগ্নের সেই একটা মজার শব্দ এত বছর পরেও আমাদের প্রতিদিনের কথায় ঘুরে বেড়ায়। পরেরবার কেউ “গুগল মানে কী” জিজ্ঞেস করলে আপনি পুরো গল্পটা বলে দিতে পারবেন। চাইলে লেখাটা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দিন, গল্পটা তাদেরও ভালো লাগবে।
📢 সবার আগে চাকরির খবর ও তাজা সংবাদের আপডেট পেতে আমাদের- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!







