আপনার শরীরের মোট সেরোটোনিনের প্রায় ৯০ শতাংশ তৈরি হয় অন্ত্রের কোষে, মস্তিষ্কে নয়। মন ভালো রাখার রসায়ন তাই শুধু মাথার ভেতরের গল্প নয়।
এন্ডোরফিন, ডোপামিন, সেরোটোনিন আর অক্সিটোসিন, এই চারটিকে আমরা সাধারণভাবে সুখের হরমোন বলি। বিজ্ঞানের হিসাবে অক্সিটোসিন হরমোন, বাকি তিনটি মূলত নিউরোট্রান্সমিটার। তবে পরিচিত নামটাই চালু, তাই এই লেখাতেও চারজনকে সুখের হরমোন বলেই ডাকব।
আজ এই চারজনকে বন্ধু ভেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। কোন কাজে কে খুশি হয়, সেটা নিচেই পাবেন। ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে একটা টাকাও খরচ হয় না।
সংক্ষেপে উত্তর: সুখের হরমোন বাড়ানোর চারটি সহজ পথ আছে। ব্যায়াম ও হাসিতে বাড়ে এন্ডোরফিন, ছোট লক্ষ্য পূরণে ডোপামিন, রোদ ও পরোপকারে সেরোটোনিন, আর আলিঙ্গন ও আপনজনের সঙ্গে সময় কাটালে অক্সিটোসিন। প্রতিদিনের ছোট অভ্যাসই এখানে আসল ভরসা।
এই চার বন্ধুকে নিয়ে এত কথা কেন?
ইনকাম, পরীক্ষা, সংসার নিয়ে আমরা সারাদিন দৌড়াই। মন ভালো আছে কি না, সেটা ভাবার সময় হয় না। অথচ মন খারাপ থাকলে কাজ, ঘুম, খাওয়া সবই এলোমেলো হয়ে যায়।
সুখের হরমোন ওষুধের দোকানে কিনতে হয় না। আপনার শরীর নিজেই বানায়, আপনার দৈনন্দিন আচরণের জবাবে। কোন কাজে কোনটা বাড়ে জানা থাকলে মন ভালো রাখার নিজস্ব একটা তালিকা বানানো যায়।
চার বন্ধুর পরিচয়: কে কী করে, কীভাবে পাবেন?
এন্ডোরফিন কী এবং কীভাবে বাড়ে?
এন্ডোরফিন শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক। ব্যথা বা চাপের সময় হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থি এটি ছাড়ে। এটি ব্যথার সংকেত কমায় আর মনকে হালকা করে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের স্বাস্থ্য-নির্দেশিকা অনুযায়ী এন্ডোরফিন মস্তিষ্কের রিসেপ্টরে বসলে ডোপামিনও ছাড়ে। এই যোগসূত্রের কারণেই এক বন্ধু জাগলে অন্যজনও সাড়া দেয়।
এন্ডোরফিন বাড়ানোর পরিচিত উপায়:
- ব্যায়াম: দিনে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা, দৌড় বা সাইকেল চালানো
- প্রাণখোলা হাসি: বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা মজার কিছু দেখা
- গান ও নাচ: গলা ছেড়ে গাওয়া বা পছন্দের গানে শরীর দোলানো
- দলগত কাজ: ১২ জন রোয়ারকে নিয়ে করা একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, দলে ব্যায়াম করলে এন্ডোরফিনের প্রভাব বেশি হয়
ডোপামিন কী এবং কখন কাজ করে?
ডোপামিন মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থার প্রধান রাসায়নিক। কোনো লক্ষ্য ছুঁতে পারলে বা ভালো কিছুর প্রত্যাশায় এটি বাড়ে। কাজ শুরু করার তাগিদটাও আসে এখান থেকেই।
ডোপামিনকে সুস্থভাবে জাগানোর কয়েকটি উপায়:
- সকালে তিনটি ছোট কাজ লিখে রাখুন, শেষ হলে টিক দিন
- সন্তান, সহকর্মী বা জীবনসঙ্গীর ভালো কাজে মন খুলে প্রশংসা করুন
- মাসে একটা নতুন কিছু শেখার লক্ষ্য রাখুন, যেমন নতুন একটা রান্না বা নতুন একটা সফটওয়্যার
এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা ঘেঁটে দেখার পর আমি নিজে একটা ছোট নিয়ম ধরেছি। সকালে তিনটা কাজ লিখে রাখি। বিকেলে সবগুলোয় টিক পড়লে মনটা সত্যিই হালকা লাগে। কাজ ছোট হলেও শেষ করার তৃপ্তিটা বড়।
সস্তা ডোপামিন বনাম সুস্থ ডোপামিন
ফেসবুক-ইউটিউবে একের পর এক রিলস বা শর্টস স্ক্রল করলে তাৎক্ষণিক একটা ভালো লাগা মেলে। একে অনেকে সস্তা ডোপামিন বলেন। কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে মন খারাপ ও মনোযোগ কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বই পড়া, হাতের কাজ শেষ করা বা পরিশ্রমে কিছু অর্জন করা সুস্থ ডোপামিনের উৎস। এখানে আনন্দটা দেরিতে আসে, কিন্তু টেকে বেশি সময়।
ডোপামিন ডিটক্স নামটা এখন খুব চালু। বিজ্ঞানীরা বলেন, এর মানে আসলে ডোপামিন কমানো নয়। দিনের কিছুটা সময় অতিরিক্ত উদ্দীপনা থেকে, যেমন ফোন থেকে, বিরতি নেওয়া।
নিকোটিনের মতো পদার্থও ডোপামিন বাড়িয়ে সাময়িক ভালো লাগা তৈরি করে। সেই শর্টকাটই অনেক সময় আসক্তির পথ খুলে দেয়। সিগারেট কি মাদক নিয়ে আলাদা লেখায় বিষয়টা বিস্তারিত বলেছি।
সেরোটোনিন কোথায় তৈরি হয় এবং কীভাবে বাড়ে?
সেরোটোনিন মেজাজ, ঘুম আর ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গবেষণা অনুযায়ী অন্ত্রের বিশেষ কোষেই থাকে ৯০ শতাংশের বেশি সেরোটোনিন। বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসএসআরআই ওষুধও এই রাসায়নিকের ওপরই কাজ করে।
সেরোটোনিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের উপায়:
- সকালের রোদ: সূর্যালোকের সঙ্গে সেরোটোনিনের যোগ নিয়ে গবেষণা আছে, তাই সকালে কিছুক্ষণ বাইরে হাঁটুন
- পরোপকার: বাসে বয়স্ক মানুষকে সিট ছেড়ে দেওয়া, রাস্তা থেকে কলার খোসা সরিয়ে ফেলা। কামিনী রায়ের কবিতার সেই ভাবনা, অন্যের জন্য বাঁচা, এখানেই মেলে
- শান্ত মনের চর্চা: ধ্যান বা একাগ্র মনে প্রার্থনায় অনেকেই প্রশান্তি পান
- দেশি খাবার: সেরোটোনিন বানাতে ট্রিপটোফ্যান নামের অ্যামাইনো অ্যাসিড লাগে। ডিম, দুধ, বাদাম, মিষ্টি কুমড়ার বীজ, পালং শাক ও মাছে এটি পাওয়া যায়
অক্সিটোসিনকে কেন “ভালোবাসার হরমোন” বলা হয়?
অক্সিটোসিন তৈরি হয় হাইপোথ্যালামাসে, আর ছাড়া হয় পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে। সন্তান প্রসব ও বুকের দুধ খাওয়ানোয় এর বড় ভূমিকা আছে। আপনজনের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনেও এটি জড়িত বলে এই নাম।
অক্সিটোসিনের জন্য খরচ লাগে না, লাগে সময়:
- বাবা-মায়ের পাশে বসে দশ মিনিট গল্প করা
- প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরা বা করমর্দন করা
- দূরের আপনজনকে ফোন করে কণ্ঠস্বর শোনা
স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের সঙ্গে চার বন্ধুর সম্পর্ক কী?
কর্টিসল শরীরের প্রধান স্ট্রেস হরমোন, যা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। বিপদের সময় এটি আমাদের সতর্ক রাখে। কিন্তু দীর্ঘদিন বেশি থাকলে ঘুম ও মেজাজ নষ্ট হতে পারে।
গবেষণায় ইঙ্গিত আছে, এন্ডোরফিন বা অক্সিটোসিন বাড়লে শরীরের কর্টিসলের সাড়া কমে। সেজন্যই হাঁটার পর বা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানোর পর শরীর রিল্যাক্স বোধ করে।
শিশুদের মানসিক বিকাশে সুখের হরমোনের ভূমিকা কী?
শিশুর মানসিক বিকাশে খেলা, প্রশংসা, সহমর্মিতা আর আদর, এই চারটির কোনোটাই বাদ দেওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের দিনে গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিক কাজ দরকার।
- এন্ডোরফিনের জন্য: মোবাইল স্ক্রিনের বদলে মাঠে খেলতে পাঠান
- ডোপামিনের জন্য: ছোট অর্জনেও “সাবাশ” বলুন
- সেরোটোনিনের জন্য: খাবার ভাগ করে খাওয়া, সহপাঠীকে ছাতার নিচে ডেকে নেওয়ার মতো কাজে উৎসাহ দিন
- অক্সিটোসিনের জন্য: কাজ যত ব্যস্তই হোক, রাতে সন্তানকে কোলে নিন
যা অনেকেই জানেন না, আর যে ভুল ধারণা ভেঙে ফেলা দরকার
চার বন্ধু আলাদা কাজ করলেও একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আপনজনের সঙ্গে সময় কাটালে অক্সিটোসিনের পাশাপাশি ডোপামিনও বাড়তে পারে বলে গবেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাই একটা অভ্যাস অনেক সময় একাধিক বন্ধুকে একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে।
মিথ বনাম বাস্তবতা
| ভুল ধারণা | বাস্তবতা |
|---|---|
| কলা বা অন্য খাবার খেলেই মস্তিষ্কে সেরোটোনিন বেড়ে যায় | একটি গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, খাবার বা অন্ত্রে তৈরি সেরোটোনিন সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছায় না। মস্তিষ্ক নিজের সেরোটোনিন নিজেই বানায়। খাবার ট্রিপটোফ্যানের মতো কাঁচামাল জোগাতে পারে মাত্র |
| দৌড়ের পরের আনন্দ শুধুই এন্ডোরফিনের কাজ | কিছু গবেষক মনে করেন এন্ডোকানাবিনয়েডসহ অন্য রাসায়নিকেরও ভূমিকা আছে। এন্ডোরফিন অবশ্যই একটা অংশ |
| ডোপামিন মানেই আনন্দের হরমোন | বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন ডোপামিন প্রেরণা ও প্রত্যাশার সঙ্গে বেশি জড়িত। কিছু পাওয়ার আগেই এটি আপনাকে সামনে ঠেলে দেয় |
সুখের হরমোন নিয়ে আপনাদের প্রশ্ন আমাদের উত্তর
সুখের হরমোন কয়টি এবং কী কী?
প্রধানত চারটি: এন্ডোরফিন, ডোপামিন, সেরোটোনিন ও অক্সিটোসিন। এগুলোকেই সাধারণভাবে সুখের হরমোন বলা হয়। বিজ্ঞানীরা অবশ্য আরও অনেক রাসায়নিক নিয়ে গবেষণা করছেন।
ওষুধ ছাড়া কি সুখের হরমোন বাড়ানো যায়?
জীবনযাপনের অভ্যাস বদলে এই রাসায়নিকগুলোকে সহায়তা করা যায়, যেমন নিয়মিত হাঁটা, রোদে সময় কাটানো আর প্রিয়জনের সঙ্গ। তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ চললে নিজে থেকে বন্ধ করবেন না।
সুখের হরমোন কমে গেলে কী হয়?
মন খারাপ, ক্লান্তি আর কোনো কিছুতে আগ্রহ না পাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে এর কারণ নানা রকম হতে পারে। এমন অবস্থা দুই সপ্তাহের বেশি চললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শেষ কথা: ধারাবাহিকতাই আসল ওষুধ
এই চার বন্ধু একদিনের অতিথি নন। এক সপ্তাহ হেঁটে তারপর থেমে গেলে উপকারও থিতিয়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গবেষকরা বড় কোনো পরিবর্তনের চেয়ে ছোট অভ্যাস ধরে রাখার ওপরই বেশি জোর দেন।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়তে গিয়ে আমি দেখেছি, দৈনন্দিন ছোট রুটিন বদলালেই বেশি ফল মেলে। আমি নিজে চেষ্টা করি দিনের শেষে অন্তত একবার বাবা-মায়ের পাশে বসতে। আপনিও আজ একটা অভ্যাস বেছে নিন, আর লেখাটা প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করুন।
এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য, কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয়। দীর্ঘদিন মন খারাপ, ঘুমের সমস্যা বা কোনো কিছুতে আগ্রহ না পাওয়ার মতো অবস্থা থাকলে একজন চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। ওষুধ চলতে থাকলে নিজে থেকে কোনো পরিবর্তন করবেন না।










