গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলা পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত করেছে। আজ ভোর থেকে আরও অন্তত ৩৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা গত কয়েক দিনের নিহতের সংখ্যা ৩০ জনের বেশি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।
অবরোধের কারণে গাজার প্রধান শহরগুলোতে পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। স্বাভাবিক খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে, ফলে বাসিন্দারা মারাত্মক জীবনসংকটে পড়েছেন। শহরের হাসপাতালগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
চলুন জানি- ইসরাইল ফিলিস্তিন যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে
যুগের আলো’র সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ অনুসরণ করুন
ইসরাইল ফিলিস্তিন যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা: বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ২.৮ লাখ ছাড়িয়েছে
গাজায় যুদ্ধ পরিস্থিতি আবারও চরমে উঠেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, ১৮ মার্চ ২০২৫ তারিখে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করার পর থেকে কমপক্ষে ২৮০,০০০ ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
গাজার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অব্যাহত বিমান হামলার ফলে বহু আবাসিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ, এবং উদ্ধারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন যে তারা সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচেই মারা গেছেন।
এই বাস্তুচ্যুতি শুধুমাত্র গৃহহীনতার সংকট তৈরি করেনি, বরং খাদ্য, পানি, ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত লক্ষাধিক মানুষের জীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে।
ফিলিস্তিনের যুদ্ধ: চিকিৎসা খাতে ভয়াবহ বিপর্যয়
গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সভাপতি জানান, সাম্প্রতিক একাধিক ইসরায়েলি হামলায় ১৫ জন চিকিৎসক ও জরুরি সেবাকর্মী নিহত হয়েছেন। তিনি এটিকে “গাজা যুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোর” একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং একে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি অভিযানে ৫০,৫২৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,১৪,৬৩৮ জন আহত হয়েছেন। তবে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে — ৬১,৭০০+ এরও বেশি নিহত, কারণ হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
আরও পড়ুন
গাজার হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি চরমে পৌঁছেছে। বহু হাসপাতাল বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে আহতদের চিকিৎসা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আরো পড়ুন: এক্স মানে কি গুগল? না জানলে জেনে নিন এর বিভিন্ন অর্থ ও ব্যবহার


ইসরাইল ফিলিস্তিন যুদ্ধের কারণ: ৭ অক্টোবরের হামলা এবং যুদ্ধের সূচনা
বর্তমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ৭ অক্টোবর, ২০২৩ সালের হামাস-নেতৃত্বাধীন আকস্মিক আক্রমণ। ওই দিন, সশস্ত্র হামাস যোদ্ধারা দক্ষিণ ইসরায়েলের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রবেশ করে ব্যাপক হামলা চালায়, যেখানে কমপক্ষে ১,১৩৯ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হন এবং ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে অপহরণ করা হয়।
এই নজিরবিহীন আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল সরকার ‘পূর্ণমাত্রার সামরিক প্রতিক্রিয়া’ ঘোষণা করে এবং গাজা উপত্যকায় ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের সূচনা করে। ফলে শুরু হয় এক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও সহিংস ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্ব—যার মধ্যে রয়েছে:
- ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ববিরোধী আন্দোলন
- গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ
- জেরুজালেমে ধর্মীয় স্থান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা
- ইসরায়েল-হামাস সম্পর্কের চরম বৈরিতা
আরো পড়ুন: ২০২৫ সালে মাসে ৫ হাজার ডলার প্যাসিভ ইনকাম অর্জন করার ৭ উপায়
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক চাপ: তীব্র নিন্দা, কিন্তু সমাধান অনিশ্চিত
ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের চলমান ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লীগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ যুদ্ধবিরতির জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি, এবং যুদ্ধ থামানোর জন্য বাস্তবিক ও সমন্বিত উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গাজায় “সম্পূর্ণ মানবিক বিপর্যয়” ঘোষণা করেছেন এবং যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি জরুরি মানবিক সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও গাজার অবরোধ এবং বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো, যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্তের দাবি তুলেছে। তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে চিহ্নিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দেশগুলো—মিশর, কাতার ও জর্ডান—মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনও এ সংঘর্ষে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে, তবে ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।
আরো পড়ুন: যেভাবে বই পড়ে অর্থ উপার্জন করতে পারেন


ফিলিস্তিন মানচিত্র ও চিত্র বিশ্লেষণ: সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাজার উত্তরাংশ
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর উপগ্রহ চিত্র ও ময়দানি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গাজার উত্তরাঞ্চল বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সাম্প্রতিক মানচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অঞ্চলের বেশিরভাগ হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শরণার্থী শিবির সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
বিশেষ করে বেইত লাহিয়া, জাবালিয়া, ও শুজাইয়া এলাকায় বিস্তৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধরা পড়েছে স্যাটেলাইট চিত্রে। এতে দেখা যায়:
- রাস্তাঘাট ধ্বংস, যাতায়াত পুরোপুরি অচল
- চিকিৎসা সুবিধা অকার্যকর, কারণ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো আংশিক বা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত
- রিফিউজি ক্যাম্প ও স্কুলগুলোতে লক্ষ্যনীয় ক্ষতি
ফিলিস্তিন ইসরায়েলের যুদ্ধ: সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বর্তমান ফিলিস্তিন ইসরায়েলের যুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত নয়—এটি একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের হামলা, বাস্তুচ্যুতি, এবং খাদ্য-চিকিৎসার সংকট লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে এক অন্ধকার অধ্যায় রচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী দিনে নিহতের সংখ্যা আরও কয়েক হাজারে পৌঁছাতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান শোনা গেলেও, সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত টেকসই সমাধানের আশা করা কঠিন। যুদ্ধবিরতি, মানবিক করিডোর স্থাপন এবং যুদ্ধাপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত—এই তিনটি পদক্ষেপকে সামনে রেখে যদি বিশ্ব নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নেয়, তবে এই সংকট প্রশমিত হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
অন্যথায়, এই যুদ্ধ শুধু গাজা বা ইসরায়েল নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের বার্তা বহন করবে।